ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতরে ভাঙচুর, বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের অভিযোগ
ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ। বিজেপিকে দায়ী করলেন অভিষেক, অভিযোগ অস্বীকার গেরুয়া শিবিরের।
ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতরে ভাঙচুর, ‘বিজেপি হামলা’র অভিযোগ তৃণমূলের

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ১৩ : তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অভিযোগ, ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ একদল মুখোশধারী ব্যক্তি দফতরে ঢুকে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম ভাঙচুরের পাশাপাশি কয়েকটি সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার জন্য সরাসরি বিজেপিকে দায়ী করেছেন। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হামলা এবং বিরোধী দলের উপর ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে বিজেপি পাল্টা দাবি করেছে, ঘটনার দায় তাদের উপর চাপানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভোররাতে আচমকা হামলার অভিযোগ
তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টে নাগাদ কয়েকজন সশস্ত্র ও মুখোশধারী ব্যক্তি ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরে ঢুকে পড়ে। সেখানে উপস্থিত কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পাশাপাশি দফতরের বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে মুখ ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে দফতরের ভিতরে তাণ্ডব চালাতে এবং পরে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দফতরের আসবাবপত্র, কাচ, টেলিভিশন-সহ একাধিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ। তৃণমূলের আরও দাবি, সেখানে থাকা কর্মীদের মোবাইল ফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
বিলবোর্ড বিতর্ক থেকেই কি নতুন সংঘাত?
এই হামলার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন কয়েকদিন ধরেই ক্যামাক স্ট্রিটের ওই দফতরকে ঘিরে কলকাতা পুরসভা, কলকাতা পুলিশ এবং তৃণমূলের মধ্যে সংঘাত চলছিল।
গত ২৭ আগস্ট কলকাতা পুরসভা ও পুলিশের একটি দল ওই ভবনে থাকা একটি বড় বিলবোর্ড সরাতে গেলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুরসভা ও পুলিশের দাবি ছিল, বিলবোর্ডটি নিয়ম মেনে অনুমোদিত হয়নি। অভিযানকে ঘিরে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। ঘটনাস্থলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েন উপস্থিত ছিলেন।
এই ঘটনায় পুলিশকে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। বিলবোর্ড বিতর্কের তদন্তের অংশ হিসেবে ডেরেক ও’ব্রায়েনকেও কলকাতা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
ফলে কয়েকদিনের ব্যবধানে একই দফতরকে কেন্দ্র করে পরপর দুটি ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।
অভিষেকের সরাসরি বিজেপিকে নিশানা
দফতরে ভাঙচুরের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে বিজেপিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সশস্ত্র বিজেপি কর্মীরা দফতরে হামলা চালিয়েছে এবং পুলিশকে বারবার জানানো সত্ত্বেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিষেক একইসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ঘটনার তদন্ত ও অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘রাজনৈতিক গুণ্ডামি’ এবং বিরোধী দলের উপর হামলা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দলের দাবি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে এ ধরনের হামলা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, দফতরে থাকা কর্মী ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বারবার ফোন এবং ই-মেল করে পুলিশকে জানানো হলেও প্রায় দুই ঘণ্টা যথাযথ সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে এই অভিযোগের পাশাপাশি ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে। হামলাকারীরা কারা, কী উদ্দেশ্যে তারা দফতরে ঢুকেছিল এবং তাদের পিছনে কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না—সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিজেপির পাল্টা জবাব
তৃণমূলের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বিজেপি। বিজেপি নেতাদের দাবি, এই হামলার সঙ্গে দলের কোনও কর্মী বা নেতৃত্বের যোগ নেই। বিজেপির পক্ষ থেকে বরং ঘটনাটিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল বলেও দাবি করা হয়েছে।
ফলে একদিকে তৃণমূলের ‘বিজেপি হামলা’র অভিযোগ, অন্যদিকে বিজেপির সেই অভিযোগ খারিজ—দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।
ক্যামাক স্ট্রিটে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
ঘটনার পর ক্যামাক স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আর উত্তপ্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ঘটনায় কয়েকজনকে আটক/গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে হামলাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
নতুন করে তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি
একদিকে বিলবোর্ড অপসারণকে কেন্দ্র করে পুরসভা-পুলিশের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘাত, অন্যদিকে কয়েকদিনের মধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ—পরপর এই ঘটনাগুলি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ফের উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ঘটনার প্রকৃত নেপথ্য কারণ কী এবং হামলার পিছনে কারা রয়েছে, তদন্তে তার উত্তর মিলবে। তবে আপাতত ক্যামাক স্ট্রিটের এই ঘটনা ঘিরে তৃণমূল-বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাত যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
