দুর্গাপূজায় আমিষ বিতর্ক! বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পাল্টা দিলীপ ঘোষ
দুর্গাপূজায় মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পাল্টা দিলীপ ঘোষ। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কী বললেন তিনি?
দুর্গাপূজায় আমিষ বিতর্ক!বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পাল্টা দিলীপ ঘোষ

সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক ৫ : দুর্গাপূজায় আমিষ খাবার খাওয়া যাবে কি না—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বাংলায় তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুর্গাপূজার সময়ে মাছ-মাংস খাওয়ার বিরোধিতা করে মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের পীঠাধীশ্বর ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী ওরফে বাগেশ্বর বাবা মন্তব্য করার পরই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এবার সেই মন্তব্যের পাল্টা অবস্থান স্পষ্ট করলেন বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ধর্মীয়-সামাজিক ঐতিহ্যকে বাইরে থেকে কোনও নির্দেশ বা ‘নিদান’ দিয়ে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিষয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
🐟 ‘আমি নিজেও মাছ খাই’, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে দিলীপের সওয়াল
দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দিলীপ ঘোষ নিজের অবস্থান জানিয়ে বলেন, তিনি নিজেও মাছ খান। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—কে কী খাবেন, সেটা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়; কারও ওপর তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলার সঙ্গে মাছের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ করে কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা হলে তা সহজে মেনে নেওয়া হবে না বলেই কার্যত বার্তা দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের নিজস্ব জায়গা রয়েছে, কিন্তু সেই কারণে একজনের খাদ্যাভ্যাস অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
🛕 বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে পাল্টা যুক্তি
দিলীপ ঘোষ তাঁর বক্তব্যে বাংলার শাক্ত ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বলিদানের প্রথার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। বাংলার বহু প্রাচীন দুর্গাপূজা ও কালীপূজায় পাঁঠা বলি এবং সেই সঙ্গে মাংস প্রসাদ হিসেবে গ্রহণের রীতির কথা তিনি স্মরণ করান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতি বহুস্তরীয় এবং তার সঙ্গে স্থানীয় রীতি, আচার, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ফলে অন্য কোনও অঞ্চলের ধর্মীয় রীতি বা মতামত বাংলার ওপর একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না।
এই প্রসঙ্গেই তিনি বাংলার সনাতন ঐতিহ্য এবং স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারার কথাও উল্লেখ করেন বলে জানা গিয়েছে।
🔥 বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য ঘিরেই শুরু বিতর্ক
সম্প্রতি দুর্গাপূজার সময়ে মাছ-মাংস খাওয়ার বিরোধিতা করে বাগেশ্বর বাবা মন্তব্য করেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজনৈতিক মহল—সর্বত্র শুরু হয় বিতর্ক।
বিশেষ করে বাঙালির দুর্গাপূজা এবং খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে মাছ ও মাংসের দীর্ঘ সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—দুর্গাপূজার সময়ে আমিষ খাওয়া নিয়ে বাইরে থেকে কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করা কতটা যুক্তিযুক্ত?
এই পরিস্থিতিতেই দিলীপ ঘোষের মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
🍤 মণ্ডপে ফিশ ফ্রাই, কাটলেট নিয়েও দিলীপের আগের বক্তব্য
তবে দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের কথাও উঠে এসেছে। এর আগে খড়্গপুরে দুর্গাপূজার মণ্ডপের মূল চত্বরের শুচিতা বজায় রাখার স্বার্থে ফিশ ফ্রাই, কাটলেটের মতো খাবারের দোকান মণ্ডপের মূল অংশ থেকে কিছুটা দূরে রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, পুজোমণ্ডপের ধর্মীয় পরিবেশ ও শুচিতা বজায় রাখার প্রশ্নটি একদিকে থাকলেও, তার অর্থ এই নয় যে গোটা বাঙালি সমাজের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হবে।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে সেই পার্থক্যটিই স্পষ্ট হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।
🗣️ ‘খাওয়াদাওয়ার ওপর ফতোয়া মানবে না বাঙালি’
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের মূল বার্তা, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে জোর করে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। পুজোর সময়ে কেউ নিরামিষ খাবেন, কেউ আমিষ খাবেন—এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলেই তিনি কার্যত স্পষ্ট করেছেন।
বাংলার দুর্গাপূজা যে শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব—এই বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্যান্ডেল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া—সবকিছু মিলিয়েই বাংলার উৎসবের নিজস্ব চরিত্র তৈরি হয়েছে। ফলে খাবারের বিষয়টি নিয়ে কোনও ‘ফতোয়া’ বা জোরপূর্বক বিধিনিষেধ বাঙালি মেনে নেবে না বলেই মত তাঁর।
🏛️ রাজনৈতিক মহলেও জোর চর্চা
দিলীপ ঘোষের এই মন্তব্যের পাশাপাশি বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, পুজোয় আমিষ খাবার বা পাঁঠার মাংস খাওয়া বাঙালি সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের অংশ।
বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, দুর্গাপূজা বাংলার সর্বজনীন উৎসব। সেখানে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও দুর্গাপূজাকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও সর্বজনীন উৎসব হিসেবে তুলে ধরে খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
⚖️ ধর্মীয় রীতি বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—বিতর্কের কেন্দ্রে দুই প্রশ্ন
এই বিতর্কে কার্যত দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, ধর্মীয় আচার ও পুজোমণ্ডপের শুচিতা কীভাবে বজায় রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা কতটা সম্মান করা হবে।
একদিকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি অনুসরণকারী মানুষের বিশ্বাস ও আচার রয়েছে, অন্যদিকে বাংলার বহুমাত্রিক সংস্কৃতিতে এমন বহু পরিবার রয়েছে যেখানে দুর্গাপূজার দিনগুলিতেও মাছ-মাংস রান্না ও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
ফলে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন বক্তব্যে উঠে আসছে।
🎯 নজরে আসন্ন দুর্গাপূজা
দুর্গাপূজা যত এগিয়ে আসছে, আমিষ খাবার নিয়ে এই বিতর্ক ততই রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। বাংলার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে কোনও নতুন নির্দেশিকা বা রাজনৈতিক অবস্থান সামনে আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
তবে দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে আপাতত যে বার্তা স্পষ্ট, তা হল—পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম থাকতে পারে, কিন্তু বাঙালির ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর করে কোনও নিষেধাজ্ঞা চাপানো যাবে না।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নেই এখন জমে উঠেছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পর দিলীপ ঘোষের পাল্টা অবস্থান যে এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে, তা বলাই যায়। আসন্ন দুর্গাপূজার আগে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা আরও কতটা বাড়ে, এখন সেটাই দেখার।
