পাকিস্তান-চীনের যৌথ সীমান্ত কমিশন প্রত্যাখ্যান ভারতের, ‘আইনি ভিত্তিহীন’ বলল নয়াদিল্লি
পাকিস্তান-চীনের Boundary Joint Commission-এর প্রথম বৈঠকের পর তীব্র আপত্তি ভারতের। কমিশনকে ‘আইনি ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান নয়াদিল্লির।
পাকিস্তান-চীনের ‘যৌথ সীমান্ত কমিশন’ প্রত্যাখ্যান ভারতের

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৭: পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত ‘Pakistan-China Boundary Joint Commission’-এর প্রথম বৈঠককে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদে বুধবার এই কমিশনের উদ্বোধনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির স্পষ্ট বক্তব্য, ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে পাকিস্তান ও চীনের এই ধরনের যৌথ ব্যবস্থা আইনি ভিত্তিহীন এবং ভারতের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কোনও স্বীকৃত সীমান্ত নেই। তাই ভারতীয় ভূখণ্ড সংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশ মিলে কোনও ধরনের সীমান্ত ব্যবস্থা বা চুক্তি করলে তার কোনও বৈধতা ভারত স্বীকার করবে না।
ইসলামাবাদে প্রথম বৈঠক, কী নিয়ে আলোচনা?
পাকিস্তান ও চীন দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করে আসছিল। বুধবার ইসলামাবাদের পাকিস্তানি বিদেশ মন্ত্রকের দফতরে Pakistan-China Boundary Joint Commission-এর প্রথম বৈঠক হয়।
পাকিস্তানের বিদেশ দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কমিশনের মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, যৌথ সীমান্ত সমীক্ষা, সীমান্তবর্তী বাণিজ্য এবং মানুষের যাতায়াত বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে সহযোগিতা করা হবে। বৈঠকে চীনের বিদেশ মন্ত্রকের Boundary and Ocean Affairs বিভাগের উপ-মহাপরিচালক লি ইয়া এবং পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের চীন বিষয়ক মহাপরিচালক বিলাল মাহমুদ চৌধুরী যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই কমিশনকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের সরাসরি আপত্তি কোথায়?
এই কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই নয়াদিল্লি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতের অবস্থান এই বিষয়ে “স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক”।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের সমগ্র অঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের যে অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি নিয়ে ইসলামাবাদ কোনও তৃতীয় দেশের সঙ্গে এমন কোনও ব্যবস্থা করতে পারে না, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডগত অবস্থানকে প্রভাবিত করে।
জয়সওয়াল আরও বলেন, ভারত এই তথাকথিত যৌথ কমিশনকে কোনও আইনি ভিত্তি নেই বলে প্রত্যাখ্যান করছে।
১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি ফের আলোচনায়
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে ১৯৬৩ সালের China-Pakistan Boundary Agreement।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই ওই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি। নয়াদিল্লির বক্তব্য, ওই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান শাক্সগাম উপত্যকার একটি অংশ চীনের হাতে তুলে দিয়েছিল। ভারতের দাবি, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে ইসলামাবাদের এমন কোনও চুক্তি করার বৈধ অধিকার ছিল না।
রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ভারত ১৯৬৩ সালের তথাকথিত চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি এবং নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে সেটি অবৈধ ও অকার্যকর।
‘ভারতের সার্বভৌমত্বে কোনও প্রভাব পড়বে না’
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও চীন নিজেদের মধ্যে যে কোনও ধরনের সীমান্ত সহযোগিতা করলেও ভারতীয় ভূখণ্ডের উপর ভারতের সার্বভৌমত্বের অবস্থানে তার কোনও প্রভাব পড়বে না।
ভারত জানিয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডের অবস্থান পরিবর্তন করা কিংবা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে বৈধতা দেওয়ার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে নয়াদিল্লি।
অর্থাৎ, পাকিস্তান ও চীন নিজেদের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে, সেটিকে ভারত তার নিজস্ব ভূখণ্ড সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও স্বীকৃতি দিচ্ছে না।
পাকিস্তানকে ‘দখল করা এলাকা’ ছাড়ার আহ্বান ভারতের
এই ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও কড়া বার্তা দিয়েছেন রণধীর জয়সওয়াল। ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি পাকিস্তানকে ভারতের দাবি করা, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জয়সওয়ালের বক্তব্যের সারমর্ম, সীমান্ত নিয়ে এমন উদ্যোগের বদলে পাকিস্তানের উচিত ভারতের দাবি করা ভূখণ্ড থেকে সরে যাওয়া। তিনি পাকিস্তানের এই ধরনের উদ্যোগকে ‘নাটক’ বা ‘theatrics’ হিসেবে উল্লেখ করে সরাসরি আপত্তি জানান।
CPEC নিয়েও ভারতের আপত্তি
চীন-পাকিস্তান সীমান্ত সহযোগিতার প্রসঙ্গে China-Pakistan Economic Corridor বা CPEC-এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে CPEC-এর বিরোধিতা করে আসছে, কারণ এর একটি অংশ পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে যায়।
নয়াদিল্লির যুক্তি, ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে কোনও তৃতীয় দেশের অবকাঠামোগত বা অর্থনৈতিক প্রকল্প চালানো হলে সেটি ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অবস্থানের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতায় নজর নয়াদিল্লির
নতুন যৌথ সীমান্ত কমিশন চালুর ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান—দুই সম্পর্কেই সীমান্ত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক জটিলতা রয়েছে।
পাকিস্তান ও চীন নিজেদের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বললেও ভারত স্পষ্ট করেছে, ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে এই দুই দেশের কোনও সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি স্বীকৃতি দেবে না।
ফলে ইসলামাবাদে পাকিস্তান-চীন যৌথ সীমান্ত কমিশনের প্রথম বৈঠকের পরই বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে দুই দেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, অন্যদিকে ভারত সেই উদ্যোগের আইনি বৈধতাই সরাসরি প্রশ্নের মুখে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান ও চীনের নতুন সীমান্ত কমিশনকে ঘিরে তিন দেশের কূটনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে—ইসলামাবাদ ও বেজিং যেখানে এটিকে দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে দেখছে, নয়াদিল্লি সেখানে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রসঙ্গ থাকলে সেই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আইনি ভিত্তিহীন বলে গপ্রত্যাখ্যান করছে।
