৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে মাদকমুক্ত ভারত, বড় লক্ষ্য কেন্দ্রের
৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য কেন্দ্রের। মাদক পাচার, আর্থিক নেটওয়ার্ক, সিন্থেটিক ড্রাগ, ডার্কনেট ও ক্রিপ্টো লেনদেনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের নতুন রোডম্যাপ।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে মাদকমুক্ত ভারত – বড় লক্ষ্য কেন্দ্রের

নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ৬ : মাদক পাচার ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দিল কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে ভারত থেকে মাদক বাণিজ্যকে নির্মূল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির অ্যান্টি-নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স (ANTF)-এর প্রধানদের তৃতীয় জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করে এই লক্ষ্যের কথা জানান তিনি।
কেন্দ্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধুমাত্র মাদক উদ্ধার বা গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গোটা পাচারচক্র ও তার আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (NCB), রাজ্য পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দফতরের মধ্যে আরও সমন্বয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রের নজরে গোটা মাদক নেটওয়ার্ক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযানে এখন শুধু ছোটখাটো পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং মাদক সরবরাহের উৎস থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্ক পর্যন্ত ভেঙে দেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অর্থের উৎস ও আর্থিক লেনদেনেরও তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে চলতি বছর কেন্দ্র ‘Drug Control Vision Document (2026–2029)’ প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রের তৈরি তিন বছরের রোডম্যাপে গোটা মাদক নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করে সময়সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চারটি স্তম্ভের উপর মাদকবিরোধী রোডম্যাপ
কেন্দ্রের ঘোষিত রোডম্যাপটি মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের উপর তৈরি করা হয়েছে—
প্রথমত, গোয়েন্দা তথ্য ও অভিযানভিত্তিক প্রয়োগ। মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে সমন্বিত অভিযান চালানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, প্রিকারসর কেমিক্যাল ও সিন্থেটিক মাদক নিয়ন্ত্রণ। মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং নতুন ধরনের সিন্থেটিক ড্রাগের সরবরাহ ও উৎপাদনের উপর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয়ত, মাদক চাহিদা কমানো ও ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ। শুধু পাচার বন্ধ নয়, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সচেতনতার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চতুর্থত, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সমন্বয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান ও যৌথ অভিযান আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সংস্থার যৌথ অভিযান
অমিত শাহ স্পষ্ট করেছেন, শুধু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা NCB-এর পক্ষে একা এই বিশাল নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই রাজ্য সরকার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় বিভিন্ন দফতরকে একই লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সীমান্ত, বন্দর, বিমানবন্দর এবং পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থায় ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও পাচারচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিন্থেটিক ড্রাগ, ডার্কনেট ও ক্রিপ্টো লেনদেনেও নজর
বর্তমানে মাদক পাচারের ধরন বদলাচ্ছে। সেই কারণে সিন্থেটিক ড্রাগ, প্রিকারসর কেমিক্যাল, ডার্কনেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং নতুন যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাদক পাচার-এর মতো বিষয়গুলির উপরও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী তিন বছরের রোডম্যাপে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য মাদক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, পলাতক মাদক মামলার অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ মাদক তৈরির গোপন ল্যাব ধ্বংস করার মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-কে চূড়ান্ত সময়সীমা
কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-কে মাদক বাণিজ্য নির্মূলের নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। এখন ২০২৬ থেকে ২০২৯ পর্যন্ত সময়কে মিশন মোডে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, সময়সীমা এবং দায়িত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যালোচনা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাদকবিরোধী এই অভিযানে একদিকে যেমন পাচার ও ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিকেও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে মাদক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযানকে আরও সমন্বিত ও সময়বদ্ধ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
