ইরানের ৭ দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব খারিজ ট্রাম্পের? হরমুজ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ঘিরে অনিশ্চয়তা। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা।
ইরানের ৭ দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব খারিজ ট্রাম্পের? হরমুজ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
সিটি নিউজ বাংলা | ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক
ইরান-আমেরিকা সংঘাতের আবহে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল স্ট্রেইট অব হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং আমেরিকার সঙ্গে ফের আলোচনা শুরু করা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই প্রস্তাব খারিজ করেছেন বলে Wall Street Journal-কে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

কী প্রস্তাব দিয়েছে ইরান?
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য আমেরিকাকে প্রথমে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত সম্পদ ছেড়ে দেওয়া, ইরানের তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানি বন্দরগুলির ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বন্ধ করা।
ইরানের প্রস্তাবে সাত দিনের সময়কালে লেবানন-সহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক সংঘাত বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে। আমেরিকা এই শর্তগুলি পূরণ করলে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন আরাঘচি। সপ্তম দিনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
স্ট্রেইট অব হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্য এই জলপথের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ছিল এই জলপথে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা।
ট্রাম্পের অবস্থান কী?
মার্কিন সরকার এখনও প্রকাশ্যে ইরানের প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে Wall Street Journal-এর প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রস্তাবটি দ্রুত প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান মার্কিন শর্তগুলি বাস্তবে পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে তারা প্রস্তুত নয়। ফলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ফারাক রয়েছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একটি মানচিত্র পোস্ট করেছেন, যেখানে হরমুজ প্রণালীকে ‘Trump Strait’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এই পোস্টের মাধ্যমে জলপথটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাম বা আইনগত অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
আলোচনা কি পুরোপুরি বন্ধ?
তা নয়। সরাসরি আলোচনা না হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের যোগাযোগ চলছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন কাতার দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনা এখনও ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’। কাতারের বিদেশমন্ত্রীও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সংঘাত কমানো এবং ফের আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।
এরপর কী হতে পারে?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত কোনও সমঝোতায় পৌঁছতে পারে কি না। একদিকে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর দাবি করছে। অন্যদিকে আমেরিকা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজে অবাধ নৌ চলাচলকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে।
Wall Street Journal-কে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে এটি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত একটি প্রতিবেদন; নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও প্রকাশ্যে দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে কোনও চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও আপাতত চালু রয়েছে।
পরিস্থিতি তাই এখনও দুই দিকেই খোলা—কূটনৈতিক আলোচনা এগোতে পারে, আবার সমঝোতা না হলে সংঘাতও বাড়তে পারে।
