মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ে বাঙালি রাধানাথ শিকদারের অবদান
রাধানাথ শিকদারের জন্মদিনে স্মরণ তাঁর ঐতিহাসিক অবদান। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই ত্রিকোণমিতিক গণনায় মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ে বাঙালি গণিতবিদের অসামান্য ভূমিকার ইতিহাস।
মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ে বাঙালি রাধানাথ শিকদারের অসামান্য অবদান

কলকাতা, ৫ অক্টোবর: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে আজ গোটা বিশ্বে পরিচিত মাউন্ট এভারেস্ট। কিন্তু এই শৃঙ্গকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ হিসেবে চিহ্নিত করার ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে এক বাঙালি গণিতবিদের অসামান্য অবদান। তিনি রাধানাথ শিকদার। ১৮১৩ সালের ৫ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই গণিতবিদ ও জরিপবিদের জন্মদিনে নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর ঐতিহাসিক কৃতিত্বকে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক স্যাটেলাইট, জিপিএস কিংবা কম্পিউটার—কিছুই ছিল না। সেই সময় ত্রিকোণমিতি, জটিল গাণিতিক হিসাব এবং জরিপের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হিমালয়ের একটি দুর্গম শৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয়ের কাজ চলছিল।
তখন শৃঙ্গটির পরিচয় ছিল ‘Peak XV’ নামে। গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রধান গণনাকারী (Chief Computer) হিসেবে রাধানাথ শিকদার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও জরিপের বিপুল তথ্য নিয়ে জটিল গাণিতিক হিসাব করেন। ১৮৫২ সালে তাঁর গণনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে Peak XV-ই তখন পর্যন্ত পরিমাপ করা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
রাধানাথের গণনায় শৃঙ্গটির উচ্চতা প্রায় ২৯,০০০ ফুট উঠে আসে। পরবর্তী যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের পর ১৮৫৬ সালে উচ্চতা সরকারি ভাবে ২৯,০০২ ফুট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময় বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই হিসাব করা হয়েছিল—যা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই ছিল এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব।
কীভাবে এল ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ নাম?
Peak XV-এর উচ্চতা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে নিশ্চিত হওয়ার পর শৃঙ্গটির নামকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল অ্যান্ড্রু স্কট ওয়াহ্ ১৮৫৬ সালে শৃঙ্গটির নাম তাঁর পূর্বসূরি স্যার জর্জ এভারেস্টের নাম অনুসারে ‘Mount Everest’ রাখার প্রস্তাব দেন। জর্জ এভারেস্ট নিজে এই শৃঙ্গটি দেখেননি; তাঁর সঙ্গে শৃঙ্গটির সরাসরি মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের সম্পর্কও ছিল না।
ফলে ইতিহাসের এই অধ্যায়ে রাধানাথ শিকদারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ‘মাউন্ট রাধানাথ’ নামটি এভারেস্টের সরকারি নাম নয়। বরং বলা যায়, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গকে শনাক্ত ও তার উচ্চতা নির্ণয়ের ইতিহাসে রাধানাথ শিকদারের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে এভারেস্টের ‘নামহীন নায়ক’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
গণিতবিদের পাশাপাশি সমাজসংস্কারক
রাধানাথ শিকদার শুধু গণিত ও জরিপবিদ্যায় দক্ষ ছিলেন না, সমাজচিন্তাতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি হেনরি ডিরোজিওর ভাবশিষ্য এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসারে প্যারীচাঁদ মিত্রের সঙ্গে যৌথভাবে ‘মাসিক পত্রিকা’ প্রকাশের উদ্যোগও নিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে একজন ভারতীয় হিসেবে তাঁর মেধা ও আত্মমর্যাদাবোধও ছিল অনন্য। কর্মজীবনে ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ঘটনাও তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
আজ মাউন্ট এভারেস্টের নাম উচ্চারণ করলে সাধারণত জর্জ এভারেস্টের নামই সামনে আসে। কিন্তু সেই শৃঙ্গকে বিশ্বের সর্বোচ্চ হিসেবে চিহ্নিত করার বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে রাধানাথ শিকদারের অবদান অনস্বীকার্য।
৫ অক্টোবর তাঁর জন্মদিনে তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হোক সেই বাঙালি গণিতবিদকে, যাঁর মেধা ও গাণিতিক দক্ষতা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছে।
