শেষ ১০ টাকা নিয়ে মুরগির ছানাকে বাঁচাতে ছুটেছিল ৬ বছরের ডেরেক
মিজোরামের ৬ বছরের ডেরেক সি. লালচানহিমা নিজের শেষ ১০ টাকা নিয়ে আহত মুরগির ছানাকে বাঁচাতে ছুটেছিল। শিশুটির সহমর্মিতার সেই ঘটনা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।
নিজের শেষ ১০ টাকা নিয়ে মুরগির ছানাকে বাঁচাতে ছুটেছিল ৬ বছরের ডেরেক, শিশুর সহমর্মিতায় মুগ্ধ দেশ

সিটি নিউজ বাংলা, বিশেষ প্রতিবেদন: বয়স মাত্র ছয় বছর। পৃথিবীর অনেক কিছুই তখনও তার অজানা। কিন্তু প্রাণের মূল্য বোঝার জন্য যে বড় হয়ে উঠতে হয় না, মিজোরামের এক ছোট্ট শিশু তারই অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে মিজোরামের সাইরাং এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আজও মানুষের মনে দাগ কেটে রয়েছে। ছয় বছরের ডেরেক সি. লালচানহিমা সাইকেল চালানোর সময় অসাবধানতাবশত প্রতিবেশীর একটি মুরগির ছানার ওপর দিয়ে চলে যায়। ঘটনাটি বুঝতে পেরে ভয়, দুঃখ এবং অপরাধবোধে ভেঙে পড়ে ছোট্ট ডেরেক।
কিন্তু অন্য অনেক শিশুর মতো শুধু কান্না করে থেমে থাকেনি সে। আহত ছানাটিকে কীভাবে বাঁচানো যায়, সেটাই হয়ে উঠেছিল তার একমাত্র চিন্তা।
এক হাতে মুরগির ছানা, অন্য হাতে শেষ ১০ টাকা
ডেরেকের কাছে তখন ছিল মাত্র ১০ ভারতীয় টাকা। সেটিই ছিল তার কাছে থাকা শেষ সম্বল। সেই টাকা নিয়েই এক হাতে মুরগির ছানাটিকে তুলে নেয় সে। অন্য হাতে ১০ টাকার নোট নিয়ে ছুটে যায় স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছে চিকিৎসকদের কাছে তার অনুরোধ ছিল, ছানাটিকে যেন চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তোলা হয়। ছয় বছরের শিশুটির কাছে তখন চিকিৎসার খরচ কত হতে পারে, প্রাণীকে কীভাবে চিকিৎসা করা হয়, কিংবা একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মুরগির চিকিৎসা আদৌ সম্ভব কি না, এসব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটাই বিষয়, ছানাটিকে বাঁচাতে হবে।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই মুরগির ছানাটি মারা যায়।
ছানাটি মারা গিয়েছে, সেটাও বুঝতে পারেনি ডেরেক
ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক ছিল, ডেরেক তখনও বুঝতে পারেনি যে ছানাটিকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। তার বিশ্বাস ছিল, আরও চিকিৎসা করালে হয়তো ছানাটি সুস্থ হয়ে উঠবে।
সে চিকিৎসকদের জানায়, প্রয়োজনে আরও টাকা নিয়ে আসবে। অর্থাৎ নিজের কাছে টাকা না থাকলেও ছানাটিকে বাঁচানোর চেষ্টা থেকে পিছিয়ে যেতে রাজি ছিল না সে।
পরে তার বাবা-মা তাকে বোঝান যে ছানাটি আর বেঁচে নেই এবং তাকে আর চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়।
একটি ছবি বদলে দিল ছোট্ট ডেরেকের পরিচয়
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক নার্স সেই সময় ডেরেকের একটি ছবি তুলে রাখেন। ছবিতে দেখা যায়, এক হাতে ছোট্ট মুরগির ছানা এবং অন্য হাতে ১০ টাকার নোট নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিশুটি।
পরবর্তীতে সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের নজরে আসে ডেরেকের ঘটনা। তার বয়স যত ছোটই হোক, প্রাণীর প্রতি তার মমতা এবং দায়িত্ববোধ মানুষের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলে।
সামাজিক মাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর ডেরেককে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই তার এই আচরণকে শিশুমনের নির্মল সহমর্মিতার এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
স্কুলের সম্মাননা, PETA India-র পুরস্কার
ডেরেকের এই মানবিক উদ্যোগের খবর তার স্কুলেও পৌঁছায়। তার সহমর্মিতা এবং প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে স্কুলের পক্ষ থেকে তাকে সম্মানিত করা হয়।
পরে প্রাণী অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা PETA India ডেরেককে প্রদান করে ‘Compassionate Kid Award’।
একটি ছোট্ট মুরগির ছানাকে বাঁচানোর চেষ্টা থেকেই ছয় বছরের ডেরেক হয়ে ওঠে সহমর্মিতার প্রতীক।
১০ টাকার মূল্য নয়, মূল্য ছিল মনের
ডেরেকের কাছে সেই ১০ টাকা হয়তো ছিল সামান্য অর্থ। কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটিই ছিল তার সমস্ত সঞ্চয়। নিজের জন্য কিছু না ভেবে একটি প্রাণীকে বাঁচাতে সেই শেষ টাকাটুকুও খরচ করতে চেয়েছিল সে।
আজকের সময়ে যেখানে অসহায় প্রাণীর প্রতি মানুষের উদাসীনতার বহু ঘটনা সামনে আসে, সেখানে ডেরেকের এই ছোট্ট উদ্যোগ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
একটি শিশুর কাছে মুরগির ছানাটি ছিল শুধুই একটি প্রাণী নয়। সেটিও ছিল বাঁচার অধিকার থাকা একটি জীব।
ডেরেক হয়তো তখন জানত না ‘সহমর্মিতা’ শব্দটির অর্থ। জানত না প্রাণীকল্যাণ কী। জানত না তার হাতে থাকা ১০ টাকার নোট দিয়ে আদৌ কী করা সম্ভব। কিন্তু সে জানত একটি প্রাণ কষ্ট পাচ্ছে এবং তাকে সাহায্য করা দরকার।
সেখানেই ডেরেকের গল্পের আসল সৌন্দর্য।
বয়স তাকে ছোট করেছিল, কিন্তু তার হৃদয়ের মমতা ছিল অনেক বড়।
