প্রসেনজিতের বৈঠক অরাজনৈতিক, মিঠুন নতুন সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক অরাজনৈতিক বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। মিঠুন চক্রবর্তী পেলেন সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব, শুটিংয়ে ৩০% ভর্তুকি ও নিউটাউনে ২৫ কোটি টাকার উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার।
প্রসেনজিতের সঙ্গে বৈঠক ‘অরাজনৈতিক’, মিঠুনকে নতুন সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর!

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৫ : অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বৈঠক ঘিরে যে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ যথাযথভাবে উদযাপনের আবেদন জানাতেই অভিনেতা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
একইসঙ্গে রাজ্যের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের জন্য বড় ঘোষণা করা হয়েছে। অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে রাজ্য সরকারের নতুন সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বা ‘কালচারাল অ্যাডভাইজার’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে মিঠুনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রসেনজিৎকে ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনায় ইতি
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠককে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। অভিনেতা কি রাজনীতিতে যোগ দিতে চলেছেন? তাঁকে কি কোনও রাজনৈতিক দায়িত্ব দেওয়া হবে?—এই ধরনের প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছিল।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, বৈঠকের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করার বিষয়েই আলোচনা করতে প্রসেনজিৎ তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রসেনজিতের মূল বক্তব্য ছিল মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মবার্ষিকী ও তাঁর শতবর্ষ উদযাপনকে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা। অভিনেতার তরফে বলা হয়েছিল, “তিনি বলেছিলেন, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, আপনি সবে দায়িত্ব নিয়েছেন…”—এরপরই উত্তম কুমারকে ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা হয়।
ফলে এই বৈঠককে কেন্দ্র করে অভিনেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তার কোনও ভিত্তি নেই বলেই স্পষ্ট করা হয়েছে।
মিঠুনকে সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা করার ঘোষণা
অন্যদিকে, রাজ্যের চলচ্চিত্র জগতের জন্য আরও একটি বড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের ভূমিপুজোর মঞ্চ থেকেই অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে রাজ্য সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে মিঠুনের। অভিনয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করার সুবাদে চলচ্চিত্র শিল্পের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই রাজ্যের সাংস্কৃতিক নীতি ও চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে কাজে লাগাতে চাইছে সরকার।
মিঠুনের নতুন দায়িত্বকে ঘিরে ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্র মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রাজ্যের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন, শুটিং পরিকাঠামো এবং বাংলায় আরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
মিঠুনের অনুরোধে শুটিংয়ে ৩০ শতাংশ ভর্তুকি
মিঠুন চক্রবর্তীর অনুরোধের ভিত্তিতে রাজ্যে চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও ঘোষণা করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলায় শুটিং করতে আগ্রহী প্রযোজক ও নির্মাতাদের উৎসাহ বাড়তে পারে। রাজ্যে আরও বেশি সংখ্যক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ ও অন্যান্য অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযোজনার কাজ টানার ক্ষেত্রেও এই ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে রাজ্যের চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এবং বাংলা ও অন্যান্য ভাষার ছবির শুটিংয়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা।
২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার
মহানায়ক উত্তম কুমারের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নিউটাউনে তৈরি হতে চলেছে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার। এই প্রকল্পে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
ভূমিপুজোর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমারের অবদানকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর কাজ ও ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এই ফিল্ম সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একইসঙ্গে এই কেন্দ্রকে ঘিরে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
চলচ্চিত্র শিল্পকে ঘুরে দাঁড় করানোর বার্তা
একদিকে উত্তম কুমারের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নতুন ফিল্ম সেন্টার, অন্যদিকে শুটিংয়ে ৩০ শতাংশ ভর্তুকি এবং মিঠুন চক্রবর্তীর মতো অভিজ্ঞ অভিনেতাকে সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব—পরপর এই ঘোষণাগুলিকে রাজ্যের চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার বড় উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের প্রযোজনাকে আকৃষ্ট করতে পরিকাঠামো এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সেই জায়গায় নতুন ফিল্ম সেন্টার ও ভর্তুকির সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা আপাতত থামিয়ে দিয়ে রাজ্য সরকার বরং চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই একাধিক বড় পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছে। একদিকে উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের পরিকল্পনা, অন্যদিকে মিঠুন চক্রবর্তীর নতুন দায়িত্ব—রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিসরে আগামী দিনে এই সিদ্ধান্তগুলির প্রভাব কতটা পড়ে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
