তুরস্কে LGBTQ+ ও HIV গোষ্ঠীতে অভিযান, আটক বহু | CT News Bangla
তুরস্কে LGBTQ+ অধিকারকর্মী ও HIV সহায়তা গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান। ১৬২ জন, ৯ সংগঠন ও ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ঘিরে বিতর্ক।
তুরস্কে LGBTQ+ ও HIV সহায়তা গোষ্ঠীতে সাঁড়াশি অভিযান, আটক বহু! তদন্ত ১৬২ জন, ৯ সংগঠন ও ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
সিটি নিউজ বাংলা, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: তুরস্কে LGBTQ+ অধিকারকর্মী এবং HIV সহায়তা গোষ্ঠীগুলিকে ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় ও তল্লাশি অভিযানকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোররাত থেকে ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, ইজমির, আয়দিন এবং মেরসিন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন সংগঠনের অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থানে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

১৬২ জন, ৯ সংগঠন ও ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত
তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, দেশজুড়ে চালানো এই অভিযানের প্রেক্ষিতে ১৬২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি, ৯টি সংগঠন এবং ১৩টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রদেশে LGBTQ+ অধিকার এবং HIV সহায়তার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলির অফিস ও সংশ্লিষ্ট বারগুলিতে অভিযান চালানো হয়েছে। সেখান থেকে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লকের অভিযোগ
অভিযানের পাশাপাশি ডিজিটাল ক্ষেত্রেও সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। তুরস্কের অন্যতম পুরনো LGBTQ+ অধিকার সংগঠন Kaos GL-এর দাবি, বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে সংগঠনগুলির শারীরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অনলাইন যোগাযোগ এবং জনসচেতনতামূলক কাজও বাধার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ। অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এই ধরনের পদক্ষেপের কারণে LGBTQ+ সম্প্রদায় এবং HIV আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সহায়তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সরকারের যুক্তি কী?
তুর্কি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযানকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। সরকারের দাবি, পরিবার ও শিশুদের সুরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের অভিযোগ, কিছু LGBTQ+ সংগঠন শিশুদের যৌন অভিযোজন ও লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। পাশাপাশি, কয়েকটি সংগঠন বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনও সামনে আসেনি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির তীব্র প্রতিবাদ
অভিযানের পরেই তুরস্কের মানবাধিকার সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তুরস্কের মানবাধিকার অ্যাসোসিয়েশন (İHD) এই অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, শিশু ও পরিবার সুরক্ষার মতো বিষয়কে সামনে রেখে স্বাধীন সুশীল সমাজের সংগঠনগুলির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের দাবি, LGBTQ+ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে অপরাধমূলক সংগঠন, মাদক, পতিতাবৃত্তি এবং অশ্লীলতার মতো অভিযোগ ব্যবহার করে একটি গোটা সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কোনও সংগঠনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে স্বচ্ছ ও ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে অভিযান ও আটকের ঘটনায় সেই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধির সমালোচনা
তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিযানের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তুরস্ক বিষয়ক বিশেষ দূত নাচো সানচেজ আমোর এই গণ-গ্রেপ্তারকে দমনপীড়নের একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের পদক্ষেপ মৌলিক অধিকার এবং তুরস্কের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
LGBTQ+ সম্প্রদায়ের ওপর বাড়ছে চাপ
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকারের আমলে তুরস্কে LGBTQ+ অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এবং আইনি পদক্ষেপের অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় এবার একসঙ্গে একাধিক শহরে LGBTQ+ এবং HIV সহায়তা গোষ্ঠীকে ঘিরে অভিযান আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। একদিকে সরকারের দাবি, পরিবার ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই যুক্তির আড়ালে LGBTQ+ অধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীন সুশীল সমাজের পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১৩ সেপ্টেম্বরের এই দেশব্যাপী অভিযান তুরস্কে LGBTQ+ অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুশীল সমাজের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন নজর থাকবে তদন্তের পরবর্তী ধাপে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে তুর্কি সরকার কী অবস্থান নেয়।
