পানিহাটিতে জলজটের জেরে শিল্পে সংকট, ৩৬ কোটির নিকাশি প্রকল্প
পানিহাটিতে জলজটে বিপর্যস্ত জনজীবন ও শিল্প। টেক্সম্যাকো-সহ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত। স্থায়ী সমাধানে ৩৬ কোটি টাকার ভূগর্ভস্থ নিকাশি প্রকল্পের পরিকল্পনা।
পানিহাটিতে জল জমার জেরে শিল্পে গভীর সংকট! স্থায়ী সমাধানে ৩৬ কোটির নিকাশি প্রকল্প
পানিহাটি, স্টেট ডেস্ক ৭: দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকার সমস্যায় কার্যত বিপর্যস্ত পানিহাটি পৌর এলাকার জনজীবন ও শিল্পক্ষেত্র। বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার কারণে সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই বিস্তীর্ণ এলাকায় জল জমছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিল্পাঞ্চলের বড় বড় কারখানাতেও ঢুকে পড়ছে জমা জল। এর জেরে নিরাপত্তার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং দফায় দফায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উৎপাদন।

সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছে টেক্সম্যাকোর মতো বড় শিল্প ইউনিট। দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকার কারণে কারখানার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কারখানার ভিতরে জল ঢুকে পড়লে কর্মী ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প সংস্থার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বেহাল নিকাশি ব্যবস্থাই মূল সমস্যা
পানিহাটি পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের জল জমার সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা। বৃষ্টির জল দ্রুত বের করে দেওয়ার মতো পরিকাঠামো না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন এলাকায় জল জমে থাকছে।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। টানা বৃষ্টির পর জল নামতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই।
শুধু রাস্তাঘাট বা বসতিপূর্ণ এলাকা নয়, শিল্পাঞ্চলেও জল ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে পানিহাটির শিল্পক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
৩৬ কোটি টাকার ভূগর্ভস্থ নিকাশি প্রকল্প
এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বড়সড় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন। পানিহাটি পৌরসভা এবং পূর্ত দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার একটি Underground Drainage Project রাজ্য সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এলাকায় নতুন করে ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। এই প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে আইআইটি খড়্গপুরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রায় ৫ ফুট গভীর চ্যানেল তৈরির কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে জমা জলকে দ্রুত নির্দিষ্ট নিষ্কাশনপথে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের জল জমার সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের আশা।
তৈরি হবে স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন
শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, দ্রুত জল নিষ্কাশনের জন্য স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা KMDA-র পক্ষ থেকে মুরাগড়ছা মোড় এবং সাজিরহাট খাল সংলগ্ন এলাকায় স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন তৈরির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
পাম্পিং স্টেশন চালু হলে অতিরিক্ত বৃষ্টির জল দ্রুত সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ভারী বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা, বসতি এবং শিল্প এলাকায় জল দাঁড়িয়ে থাকার প্রবণতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিটি রোডের কভার ড্রেন পরিষ্কারে বড় উদ্যোগ
জল জমার সমস্যা মোকাবিলায় বিটি রোডের দুই পাশের কভার ড্রেনগুলিও পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
নিকাশি নালাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আবর্জনা ও পলি পরিষ্কার করা হলে জল প্রবাহের গতি বাড়বে। তবে প্রশাসনের পরিকল্পনা শুধুমাত্র অস্থায়ীভাবে ড্রেন পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজও এগোচ্ছে।
প্রশাসকের অধীনে পৌরসভা, সরেজমিনে পর্যালোচনা
বর্তমানে পানিহাটি পৌরসভা একজন প্রশাসকের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। জল জমার সমস্যা নিয়ে ইতিমধ্যেই নগরোন্নয়ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং ইঞ্জিনিয়াররা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।
পানিহাটির সামগ্রিক নিকাশি ব্যবস্থা, জল নিষ্কাশনের বর্তমান পরিকাঠামো এবং কোথায় কোথায় মূল সমস্যা রয়েছে—তা নিয়ে রিপোর্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
শিল্প ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে দ্রুত সমাধানের দাবি
পানিহাটির জল জমার সমস্যা এখন শুধুমাত্র নাগরিক দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের উপর। বড় শিল্প ইউনিটগুলির কাজ বারবার ব্যাহত হলে তার প্রভাব শ্রমিক থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসা—সর্বত্র পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শিল্প প্রতিনিধিরাও দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবিতে রাজ্য সরকারের শীর্ষ মহলে দরবার করেছেন। তাঁদের দাবি, পানিহাটির নিকাশি ব্যবস্থাকে শুধুমাত্র বর্ষাকালীন সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। শিল্পাঞ্চলের ভবিষ্যৎ এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এখন নজর ৩৬ কোটির প্রকল্পের অনুমোদনে
পানিহাটির জল জমার সমস্যা মেটাতে একদিকে অস্থায়ীভাবে ড্রেন পরিষ্কার ও জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্থায়ী সমাধানের জন্য ৩৬ কোটি টাকার ভূগর্ভস্থ নিকাশি প্রকল্প, পাম্পিং স্টেশন এবং মাস্টার প্ল্যানের মতো একাধিক পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
এখন মূল অপেক্ষা রাজ্য সরকারের অনুমোদন এবং প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের। দীর্ঘদিনের এই নিকাশি সংকট দ্রুত মিটলে শুধু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই কমবে না, পানিহাটির শিল্পক্ষেত্রেও ফের স্বাভাবিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ ফিরবে—এমনটাই আশা স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং শিল্পমহলের।
