হিমালয়ের হিমবাহ গলছে ৬৫% দ্রুত! জল ও অর্থনীতিতে বড় বিপদের আশঙ্কা
এক দশক আগের তুলনায় হিমালয়ের হিমবাহের ভর ক্ষয়ের হার ৬৫% দ্রুত হয়েছে। ৫৬টি হিমবাহ-হ্রদ খুব উচ্চঝুঁকিতে, বাড়ছে জল ও বন্যার আশঙ্কা।
হিমালয়ের হিমবাহের ভর ক্ষয় এক দশক আগের তুলনায় ৬৫% দ্রুত! বাড়ছে বড়সড় বিপদের আশঙ্কা
সিটি নিউজ বাংলা, এনভায়রনমেন্টাল ডেস্ক ৪: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে ক্রমশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তার অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে হিমালয়। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—হিমালয়ের হিমবাহগুলি থেকে বরফের ভর ক্ষয়ের হার এক দশক আগের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে জল নিরাপত্তা, কৃষি, জলবিদ্যুৎ, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির উপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Systemiq-এর নেতৃত্বে Integrated Mountain Initiative-এর সহযোগিতায় এবং ICIMOD ও G.B. Pant National Institute of Himalayan Environment-এর প্রযুক্তিগত অবদানে তৈরি সাম্প্রতিক মূল্যায়নে হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের বর্তমান হিমবাহের আয়তনের বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে।
পানীয় জল ও কৃষিতে বড় সংকটের আশঙ্কা
হিমালয়ের হিমবাহগুলি এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদের অন্যতম ভিত্তি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র-সহ বহু নদী অববাহিকার জলপ্রবাহের সঙ্গে এই বরফ ও তুষারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হিমবাহের দ্রুত সংকোচন দীর্ঘমেয়াদে নদীর জলপ্রবাহের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হিমবাহ দ্রুত গলার প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও কোনও নদীতে জলপ্রবাহ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বরফের মজুত কমে গেলে শুষ্ক মরশুমে নদীগুলিতে জল সরবরাহ কমতে পারে। এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কেই বিজ্ঞানীরা ‘Peak Water’ হিসেবে চিহ্নিত করেন—অর্থাৎ এমন একটি সময়, যখন হিমবাহ-নির্ভর নদীতে জলপ্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরবর্তীতে কমতে শুরু করতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে পানীয় জল, সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষি উৎপাদনের উপর। হিমালয়-নির্ভর জলসম্পদের উপর বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল হওয়ায় এর প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভারতের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাবের আশঙ্কা
হিমালয় শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার নয়, ভারতের অর্থনীতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কৃষি, জলবিদ্যুৎ, পর্যটন, তীর্থযাত্রা-সহ একাধিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিমালয়ের জল ও পরিবেশ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক রিপোর্টের হিসাব অনুযায়ী, হিমালয় থেকে পাওয়া জল ভারতের প্রায় ২০ শতাংশ জিডিপির সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে। ফলে হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য আরও নষ্ট হলে তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বাড়ছে হিমবাহ-হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি
হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ-নির্ভর হ্রদের আয়তনও বাড়তে পারে। এই হ্রদগুলির কোনও প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল নেমে এসে ভয়াবহ Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF তৈরি করতে পারে।
ভারতে ২০২৫ সালের একটি ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৫৬টি হিমবাহ-হ্রদকে ‘very high risk’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোটা ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে ১৮৯টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদ নিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
এই ধরনের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা হলে পাহাড়ি জনপদ, সেতু, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
কেন দ্রুত গলছে হিমবাহ?
হিমবাহের ভর ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তন। পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বনও হিমবাহ গলার গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জ্বালানি পোড়ানো, যানবাহন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য দূষণ উৎস থেকে নির্গত কালো কার্বনের কণা বাতাসের মাধ্যমে তুষার ও বরফের উপর জমতে পারে। বরফের উপর এই অন্ধকার কণার স্তর সূর্যের বিকিরণ বেশি শোষণ করে, ফলে গলন ত্বরান্বিত হতে পারে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নজরদারিতে বড় ঘাটতি
হিমালয় অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক হিমবাহ থাকলেও সবগুলির উপর নিয়মিত ও বিস্তারিত নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। রিপোর্ট অনুযায়ী, হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলের আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র প্রায় ২১টি-তে বিস্তারিত ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। এই বিশাল পর্যবেক্ষণ ঘাটতি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণে বড় সমস্যা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপগ্রহ-নির্ভর পর্যবেক্ষণ, মাটিতে সেন্সর, জলপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদগুলির পরিবর্তন নিয়মিত নজরে রাখা জরুরি। সময়মতো বিপদের সংকেত পাওয়া গেলে প্রাণহানি ও পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
কীভাবে মোকাবিলা সম্ভব?
এই সংকট মোকাবিলায় একাধিক স্তরে পদক্ষেপ প্রয়োজন। হিমালয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং পরিবেশের উপর অতিরিক্ত চাপ কমানো জরুরি।
একই সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বন ও অন্যান্য দূষণ কমানো, হিমবাহের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বিপদপ্রবণ এলাকায় দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকাঠামো শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হিমালয় একাধিক দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকায় সীমান্ত পেরিয়ে আবহাওয়া, জলপ্রবাহ, হিমবাহ এবং দুর্যোগ-ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ও জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামী দিনের জন্য বড় সতর্কবার্তা
হিমালয়ের হিমবাহের ভর ক্ষয়ের গতি বৃদ্ধির এই তথ্য কার্যত ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ হিমালয়ের পরিবর্তন শুধু পাহাড়ি পরিবেশকেই প্রভাবিত করে না—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি মানুষের পানীয় জল, কৃষি, জীবিকা, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
তাই হিমবাহের দ্রুত ক্ষয় রোধ, গ্রিনহাউস গ্যাস ও ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কমানো, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক নজরদারি এবং দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি—সবকিছুকেই একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে আগামী দিনে হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু ও জলচক্রে বড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের জল ও খাদ্য নিরাপত্তার উপর।
