ইমিগ্রেশন ছাড়াই দিল্লি থেকে মিউনিখের বিমানে ৩ ইতালীয়! শোকজ এয়ার ইন্ডিয়াকে
দিল্লি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন না করেই তিন ইতালীয় নাগরিক মিউনিখগামী বিমানে ওঠার অভিযোগ। এয়ার ইন্ডিয়াকে শোকজ, জরুরি বৈঠক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের।
ইমিগ্রেশন চেক ছাড়াই দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বিদেশে পাড়ি ৩ ইতালীয় নাগরিকের!
সিটি নিউজ বাংলা, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৫: দেশের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গুরুতর নিরাপত্তা ও প্রক্রিয়াগত গাফিলতির অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই তিন ইতালীয় নাগরিক দিল্লি থেকে জার্মানির মিউনিখগামী বিমানে উঠে পড়েন। ঘটনাটি সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক এয়ার ইন্ডিয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

৪ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনাটি ঘটে গত ৪ সেপ্টেম্বর। জানা গিয়েছে, তিন ইতালীয় নাগরিক এয়ার ইন্ডিয়ার AI-1115 বিমানে অমৃতসর থেকে দিল্লিতে পৌঁছন। দিল্লি থেকে তাঁদের লুফথানসারের LH-763 বিমানে মিউনিখ যাওয়ার কথা ছিল। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি রাত প্রায় ১২টা ৫০ মিনিটে দিল্লিতে পৌঁছয় এবং লুফথানসারের মিউনিখগামী বিমানটি প্রায় ১টা ৪৫ মিনিটে উড়ে যায়।
অভিযোগ, অমৃতসর বিমানবন্দরে ওই যাত্রীদের দিল্লি যাওয়ার জন্য ‘D’ অর্থাৎ ডোমেস্টিক বোর্ডিং পাসের পাশাপাশি মিউনিখগামী লুফথানসার বিমানের বোর্ডিং পাসও দেওয়া হয়েছিল।
দিল্লিতে ইমিগ্রেশন না করেই আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার এলাকায়
এই ঘটনাতেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন। অমৃতসর-দিল্লি এবং দিল্লি-মিউনিখের এই যাত্রাপথ সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত হাব-অ্যান্ড-স্পোক ব্যবস্থার আওতায় ছিল না। ফলে দিল্লিতে পৌঁছে ওই তিন যাত্রীর বিমানবন্দরের আগমনপথ দিয়ে বেরিয়ে বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার কথা ছিল।
কিন্তু অভিযোগ, দিল্লিতে পৌঁছনোর পর তাঁদের নির্ধারিত পথে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে না নিয়ে গিয়ে সরাসরি International-to-International (I-to-I) transfer area-তে পাঠানো হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন যাচাই ছাড়াই তাঁরা আন্তর্জাতিক প্রস্থানের এলাকায় পৌঁছে যান এবং পরে মিউনিখগামী বিমানে ওঠেন।
এয়ার ইন্ডিয়াকে সাত দিনের মধ্যে জবাব
ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত গাফিলতি হিসেবে দেখছে কেন্দ্র। এই ঘটনায় এয়ার ইন্ডিয়ার সিইও-র কাছে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছে অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক।
নোটিসে জানতে চাওয়া হয়েছে, ‘D’ বোর্ডিং পাস থাকা সত্ত্বেও কেন ওই তিন যাত্রীকে I-to-I ট্রান্সফার ব্যবস্থার মধ্যে পাঠানো হল এবং কীভাবে বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন যাচাই এড়িয়ে তাঁরা আন্তর্জাতিক বিমানে উঠতে সক্ষম হলেন। নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়াকে সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
অমৃতসর থেকেই কেন দেওয়া হয়েছিল আন্তর্জাতিক বোর্ডিং পাস?
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—অমৃতসর বিমানবন্দর থেকেই কেন ওই যাত্রীদের লুফথানসারের মিউনিখগামী বিমানের বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়েছিল?
কেন্দ্রীয় মন্ত্রক জানতে চেয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মীরা যাত্রীদের সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে কীভাবে পরিচালনা করেছিলেন এবং দিল্লিতে পৌঁছনোর পর তাঁদের গতিপথ কেন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। এয়ার ইন্ডিয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জরুরি বৈঠক
ঘটনাটি শুধুমাত্র বিমান সংস্থার প্রশাসনিক গাফিলতি হিসেবে দেখছে না কেন্দ্রীয় প্রশাসন। আন্তর্জাতিক যাত্রীর ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই কীভাবে তাঁরা দেশের বাইরে চলে গেলেন, তা নিয়ে নিরাপত্তা মহলেও প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জরুরি বৈঠক ডেকেছে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র ও অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকদের পাশাপাশি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো, ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন, এয়ার ইন্ডিয়া এবং দিল্লি বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উপস্থিত থাকার কথা। বৈঠকে হাব-অ্যান্ড-স্পোক ব্যবস্থায় যাত্রী স্থানান্তর এবং ইমিগ্রেশন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হতে পারে।
দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে দিল্লি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট লিমিটেড বা DIAL জানিয়েছে, এই ঘটনায় তাদের কোনও শোকজ নোটিস দেওয়া হয়নি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, IGI বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি বহু-সংস্থাভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে চলার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তদন্তে যে প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হচ্ছে
প্রাথমিকভাবে গোটা ঘটনার একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে—
- অমৃতসর বিমানবন্দর থেকে কেন ডোমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক যাত্রার বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়েছিল?
- দিল্লিতে পৌঁছনোর পর কেন ওই তিন যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পাঠানো হয়নি?
- তাঁদের কীভাবে I-to-I ট্রান্সফার এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
- আন্তর্জাতিক বিমানে ওঠার আগে তাঁদের ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস কেন যাচাই করা হয়নি?
- যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা কী ছিল?
- হাব-অ্যান্ড-স্পোক ব্যবস্থার কোন ধাপ বা প্রোটোকল এখানে অনুসরণ করা হয়নি?
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিক কোথায় এবং কার গাফিলতিতে এই ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
বিমানবন্দর নিরাপত্তায় বড় সতর্কবার্তা
দিল্লি বিমানবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কেন্দ্র। সেখানে বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না করেই তিন বিদেশি নাগরিক আন্তর্জাতিক বিমানে উঠে পড়ার অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর।
ঘটনাটি সামনে আসার পর যাত্রী হ্যান্ডলিং, ডোমেস্টিক থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে স্থানান্তর এবং ইমিগ্রেশন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় বৈঠক এবং এয়ার ইন্ডিয়ার জবাবের পরই স্পষ্ট হবে, এই ঘটনায় প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক স্তরে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
