মালদহে ভয়াবহ বন্যা, জলবন্দি লক্ষাধিক! ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ, মৃ*তের সংখ্যা ৫
মালদহে গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধি ও বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা। ভূতনি ও রতুয়া-১-এ জলবন্দি লক্ষাধিক মানুষ, ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ, বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচে পৌঁছেছে বলে দাবি।
ভয়াবহ বন্যা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা—ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ দুর্গতদের, জলবন্দি লক্ষাধিক

মালদহ, স্টেট ডেস্ক ১২ : গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধি এবং বাঁধ ভেঙে জল ঢোকার জেরে মালদহের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত মানিকচক ব্লকের ভূতনি এলাকা এবং রতুয়া-১ ব্লকের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত। একের পর এক গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়ায় বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে বাঁধ, রাস্তা ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। জলবন্দি মানুষের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সামগ্রী এখনও যথেষ্ট নয়। কোথাও ত্রিপল ও শুকনো খাবারের ঘাটতি, কোথাও আবার পানীয় জলের সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে বন্যাজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভূতনির উত্তর চণ্ডীপুরে বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জমা বন্যার জলে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিকে ঘিরে মালদহে বন্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচে পৌঁছেছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
গঙ্গার জলস্তর চরম বিপদসীমার উপরে
মালদহের বন্যা পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ গঙ্গার জলস্তরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, মানিকচকঘাটে গঙ্গার জলস্তর চরম বিপদসীমার উল্লেখযোগ্য উপরে রয়েছে। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর গঙ্গার জল চরম বিপদসীমার প্রায় ৭৪ সেন্টিমিটার উপরে বইছিল বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি ফুলহার নদীর জলও বিপদসীমার উপরে ছিল।
গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূতনির বাঁধের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জল দ্রুত ঢুকে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায়। উত্তর চণ্ডীপুর, দক্ষিণ চণ্ডীপুর ও হীরানন্দপুর—ভূতনির তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বহু জায়গায় রাস্তার উপর দিয়েই জল বইছে। ফলে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
ভূতনিতে শিশুর মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ
উত্তর চণ্ডীপুরের পূর্ব সামিরুদ্দিন টোলায় বন্যার জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ছোট্ট সাফিউর রহমানের। বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জমা জলে পড়ে যায় শিশুটি। দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
এই ঘটনার আগে ভূতনিতে আরও কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। জলে ডুবে যুবক ও কৃষকের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গিয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষদের নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ত্রাণ নিয়ে ক্ষোভ দুর্গতদের
বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ার পর বহু পরিবার বাঁধ, রাস্তার ধারে কিংবা অন্য উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সামগ্রী পর্যাপ্ত নয়। কোথাও শুকনো খাবার পৌঁছলেও ত্রিপল বা পানীয় জলের সমস্যা থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভূতনির দুর্গতদের একাংশের দাবি, দিনের পর দিন জলবন্দি থাকার কারণে খাবার, পানীয় জল, ওষুধ, শিশুখাদ্য এবং মশারির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। পর্যাপ্ত নৌকা না থাকায় প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছনোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে ত্রাণ বণ্টন নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জলমগ্ন এলাকাগুলিতে নৌকার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য পরিষেবাও সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
নৌকায় চিকিৎসা পরিষেবা, দুর্গতদের কাছে পৌঁছছেন চিকিৎসকেরা
বন্যার জেরে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র জলমগ্ন হয়ে পড়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভূতনি-সহ জলমগ্ন এলাকায় নৌকায় করে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঠানো হচ্ছে। মোবাইল মেডিক্যাল টিমগুলি দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, শিশু এবং বয়স্কদের উপর। এর আগে ভূতনি এলাকা থেকে বহু অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বাড়ায় সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম মজুত রাখার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
রতুয়া-১ ব্লকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
শুধু ভূতনি নয়, রতুয়া-১ ব্লকের মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও বন্যার জল ঢুকেছে। একাধিক গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বহু পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মহানন্দটোলা এলাকায় জল ঢুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিষেবাতেও প্রভাব পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নৌকার সাহায্যে যাতায়াত করছেন। ফলে পানীয় জল, খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্গত এলাকায় প্রশাসনের বিশেষ নজর
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকা ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশও জলমগ্ন এলাকায় নৌকায় টহল দেওয়ার পাশাপাশি ত্রাণ বণ্টনে সহযোগিতা করছে। ভূতনি এবং মহানন্দটোলা এলাকায় অতিরিক্ত নৌকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
দূরবর্তী এলাকাগুলিতে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে দুর্গত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা, চিকিৎসা পরিষেবা চালু রাখা এবং পানীয় জল ও খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের পাশাপাশি এগিয়ে স্থানীয় সংগঠন ও ব্যবসায়ীরা
বন্যার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শুধু প্রশাসন নয়, স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যবসায়ী মহলও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। মালদহ মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্স-সহ স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে চাল, ডাল, শিশুখাদ্য, মশারি-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী জলমগ্ন এলাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নৌকা ও গাড়ির মাধ্যমে দুর্গত মানুষের কাছে এই সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে প্রশাসনিক ত্রাণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগও দুর্গতদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
জল কমার অপেক্ষায় দুর্গত মানুষ
মালদহের বন্যা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখন জলস্তর নিয়ে। গঙ্গার জলস্তর যতদিন না উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, ততদিন ভূতনি, মানিকচক এবং রতুয়া-১-এর বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফেরানো কঠিন। ইতিমধ্যেই ঘরবাড়ি, রাস্তা, কৃষিজমি এবং বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার জলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবারগুলির এখন একটাই দাবি—দ্রুত এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং পানীয় জল ও চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ, দুর্গম ও জলবন্দি প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও যাতে কোনও পরিবার ত্রাণ ও চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করা।
মালদহের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নদীর জলস্তর, বাঁধের অবস্থা এবং দুর্গত মানুষের নিরাপত্তার দিকে এখন প্রশাসনের পাশাপাশি নজর রয়েছে গোটা জেলার।
