ফ্লাইদুবাই বিমানে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, সহকারী পাইলটকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে বিমান ছিনতাই ও ক্র্যাশের চেষ্টার অভিযোগ। প্রাথমিক তদন্তে ‘লোন উলফ’ হামলার ইঙ্গিত, উঠে এসেছে আগের চাকরি ও নিরাপত্তা রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন।
ফ্লাইদুবাই বিমানে একাই বিমান ছিনতাই ও ক্র্যাশের চেষ্টা সহকারী পাইলটের, তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ৩ :
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে ভয়াবহ হামলা ও বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ইসরায়েলের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই ঘটনার নেপথ্যে কোনও বিদেশি জঙ্গি সংগঠন বা গোষ্ঠীর সরাসরি নির্দেশ ছিল না। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, বিমানের সহকারী পাইলট হামাম আল-হম্মানি একাই অর্থাৎ ‘লোন উলফ’ হিসেবে এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।
তদন্ত অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা হওয়া ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে আচমকাই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিমানের সহকারী পাইলট হিসেবে দায়িত্বে থাকা ২৯ বছর বয়সী ওমানি নাগরিক হামাম আল-হম্মানি ককপিটে থাকা জরুরি কুঠার ব্যবহার করে মূল পাইলটের ওপর হামলা চালান বলে তদন্তে জানা গেছে। এরপর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটিকে বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে নামিয়ে এনে ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিমানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে শুরু করায় যাত্রীদের মধ্যেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে অন্য পাইলটের তৎপরতা এবং কয়েকজন সাহসী যাত্রীর প্রতিরোধের জেরে হামাম আল-হম্মানিকে শেষ পর্যন্ত কাবু করা সম্ভব হয়। এর ফলে বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন। পরে বিমানটি সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করে।
‘লোন উলফ’ হামলার দিকেই ইঙ্গিত তদন্তে
ইসরায়েলের প্রাথমিক তদন্তে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি, যা থেকে কোনও বিদেশি জঙ্গি সংগঠন বা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সরাসরি নির্দেশ বা অপারেশনাল সহযোগিতার প্রমাণ মেলে। বরং তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, হামাম আল-হম্মানি নিজস্ব চরমপন্থী মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একাই এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তবে তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড, যোগাযোগ, অনলাইন কার্যকলাপ এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল কি না, থাকলে সেই যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল—সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
চরমপন্থী ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার অভিযোগ
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হামাম আল-হম্মানির মধ্যে চরমপন্থী বা ইসলামপন্থী উগ্র মতাদর্শের প্রভাব থাকার কথা উঠে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, তাঁর মানসিক ও আদর্শগত পরিবর্তনের বিষয়টি এই হামলার উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে তাঁর চরমপন্থী হয়ে ওঠার নির্দিষ্ট সময়, কারও কাছ থেকে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন কি না এবং অনলাইনে বা বাস্তবে কোনও উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের এখনও চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি।
আগেও কি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হামাম আল-হম্মানির আগের চাকরি নিয়ে। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তিনি এর আগে ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থা Oman Air-এ কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর উগ্রপন্থী মতাদর্শের কারণে চাকরি চলে গিয়েছিল এবং তাঁর উড়ান সংক্রান্ত কার্যকলাপের ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই তথ্য সত্য হলে বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ, এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে তিনি কীভাবে অন্য একটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থায় সহকারী পাইলট হিসেবে নিয়োগ পেলেন—সেই বিষয়টি এখন তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন
একজন পাইলটের অতীত চাকরি, আচরণ, মানসিক অবস্থা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে তবেই সাধারণত বিমান সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই জায়গায় হামাম আল-হম্মানির আগের রেকর্ড সম্পর্কে যথাযথ তথ্য ফ্লাইদুবাইয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে, যদি Oman Air-এ তাঁর বিরুদ্ধে নিরাপত্তাজনিত কোনও নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই তথ্য আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে আদানপ্রদান হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বড় দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, হামলাকারী নিজেই বিমানের ককপিটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন সহকারী পাইলট ছিলেন। ফলে সাধারণ কোনও যাত্রীর তুলনায় তাঁর কাছে বিমান পরিচালনা ব্যবস্থা এবং ককপিটের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে অনেক বেশি জ্ঞান ছিল।
তাই মাঝআকাশে তাঁর এই ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত অন্য পাইলটের দ্রুত সিদ্ধান্ত, যাত্রীদের সাহসী ভূমিকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বিমানটি বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনার পূর্ণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সহযোগী এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় কোথায় ত্রুটি ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক তদন্তের এই তথ্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
