৪৬০ অস্থায়ী কর্মীর বেতনে মাসে ৯৩ লক্ষ, তীব্র আর্থিক সংকটে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৬০ অস্থায়ী কর্মীর বেতন বাবদ মাসে ৯৩ লক্ষ টাকা খরচ। স্থায়ী উপাচার্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় বাড়ছে আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট।
৪৬০ অস্থায়ী কর্মীর বেতন মেটাতে মাসে ৯৩ লক্ষ টাকা! তীব্র আর্থিক সংকটে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তরবঙ্গ, এডুকেশনাল ডেস্ক ৬ :
প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদ শূন্য থাকা এবং বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী কর্মীর বেতনভার—এই একাধিক সমস্যার জেরে গভীর আর্থিক সংকটের মুখে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় ৪৬০ জন অস্থায়ী কর্মীর বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৯৩ লক্ষ টাকা খরচ হচ্ছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই বেতনের দায়ভার না নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সমর বিশ্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আর্থিক কাঠামোর উপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। এমনকি পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
মাসে ৯৩ লক্ষ টাকার বেতনভার
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্থায়ী কর্মীদের বেতন মেটানো। প্রায় ৪৬০ জন অস্থায়ী কর্মীর বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৯৩ লক্ষ টাকা খরচ করতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। এই বিপুল ব্যয়ের জন্য রাজ্য সরকারের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলের উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
ফলে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে গিয়ে আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিন বছর ধরে স্থায়ী উপাচার্য নেই
শুধু আর্থিক সংকটই নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও একাধিক জটিলতার মধ্যে রয়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। গত প্রায় তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও স্থায়ী উপাচার্য নেই। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিগত পদক্ষেপে তার প্রভাব পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি রেজিস্ট্রার, ফিন্যান্স অফিসার এবং পরীক্ষা নিয়ামকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ দীর্ঘদিন খালি থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কাজের গতি ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠছে।
আট বছর ধরে বন্ধ সমাবর্তন
প্রশাসনিক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়নি। এর ফলে বহু স্নাতকোত্তর এবং গবেষণার ছাত্রছাত্রী তাঁদের প্রাপ্য সার্টিফিকেট ও সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।
বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা বা বিদেশে পড়াশোনা ও চাকরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট ও নথি সময়মতো না পাওয়ায় পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পড়ুয়াদের উপরও।
গবেষণার কাজেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা
সমাবর্তন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পাশাপাশি গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজও নানা কারণে আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ। গবেষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে স্থায়ী আধিকারিক না থাকায় একাধিক কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।
ফলে উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ও গবেষণার পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সমকাজে সমবেতন ও স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কর্মীদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। সমকাজে সমবেতন এবং স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে অস্থায়ী কর্মীরা আন্দোলন ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামলালেও তাঁদের চাকরির স্থায়িত্ব ও বেতন কাঠামো নিয়ে কোনও স্থায়ী সমাধান করা হয়নি।
ফলে একদিকে অস্থায়ী কর্মীদের আন্দোলন, অন্যদিকে তাঁদের বেতন মেটাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল আর্থিক ব্যয়—দুইয়ের জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সমাধানের অপেক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়
সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন রয়েছে তীব্র আর্থিক সংকট, তেমনই রয়েছে প্রশাসনিক শূন্যতা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ পূরণ, সমাবর্তন পুনরায় চালু করা এবং অস্থায়ী কর্মীদের বেতন ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থায়ী সমাধান—এই একাধিক বিষয় এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং পড়ুয়াদের একাংশের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন। এখন দেখার বিষয়, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটাতে রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
