বলাগড়ে ৫৩৮ কোটি টাকার জেটি প্রকল্প, বিনিয়োগে আগ্রহী আদানি-জেএসডব্লিউ
হুগলির বলাগড়ে ৫৩৮.২০ কোটি টাকার জেটি প্রকল্প ঘিরে আদানি গ্রুপ ও JSW Infrastructure-সহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর আগ্রহ। বছরে ২৭ লক্ষ টন পণ্য পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা।
বলাগড়ে ৫৩৮ কোটি টাকার জেটি প্রকল্প, বিনিয়োগে আগ্রহী আদানি-জেএসডব্লিউ

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৪ : কলকাতা বন্দরের পরিকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ জলপথে পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বড়সড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হুগলি নদীর উজানে বলাগড়ে প্রস্তাবিত বলাগড় জেটি প্রকল্প, অর্থাৎ এক্সটেন্ডেড পোর্ট গেট সিস্টেম (EPGS)-এর বাস্তবায়ন ঘিরে কলকাতায় বিশেষ রোড শোর আয়োজন করা হল। প্রায় ৫৩৮.২০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পকে ঘিরে দেশের একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠীর আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর কর্তৃপক্ষ (SMP Kolkata) এবং ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া (IWAI)-র যৌথ উদ্যোগে কলকাতার বেঙ্গল ক্লাবে এই রোড শোর আয়োজন করা হয়। শিল্প ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রকল্পটির সম্ভাবনা, পণ্য পরিবহণের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সুযোগ তুলে ধরা হয়।
কোথায় তৈরি হবে বলাগড় জেটি?
প্রস্তাবিত বলাগড় জেটি কলকাতা বন্দর থেকে হুগলি নদীর প্রায় ৮৫ কিলোমিটার উজানে, ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-১-এর ওপর বলাগড় এলাকায় গড়ে তোলা হবে। কলকাতা বন্দরের মূল পরিকাঠামোর সঙ্গে এই জেটিকে যুক্ত করে পণ্য পরিবহণের একটি বিকল্প ও কার্যকর জলপথ তৈরি করাই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমানে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বন্দরকেন্দ্রিক ভারী পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে সড়ক ও রেলপথের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে। বলাগড়ে এই আধুনিক জেটি গড়ে উঠলে জলপথকে আরও বেশি ব্যবহার করে পণ্য পরিবহণের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
বছরে ২৭ লক্ষ টন পণ্য পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা
প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে বলাগড় জেটির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২৭ লক্ষ টন বা ২.৭ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহণের সক্ষমতা তৈরি হবে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লক্ষ টন কন্টেনারজাত পণ্য এবং প্রায় ৮ লক্ষ টন কয়লা ও অন্যান্য শুকনো বাল্ক পণ্য পরিবহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে কন্টেনার পরিবহণের পাশাপাশি কয়লা-সহ বিভিন্ন ধরনের ভারী পণ্য জলপথে সরানোর ক্ষেত্রেও এই জেটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কলকাতার যানজট কমাতেও বড় ভূমিকা
বলাগড় জেটি প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কলকাতা শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলের ওপর থেকে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমানো। বর্তমানে বড় পরিমাণ পণ্য সড়কপথে পরিবহণের ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যানজট এবং পরিকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
জলপথে আরও বেশি পণ্য পরিবহণ করা সম্ভব হলে সড়ক ও রেলপথের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে। একইসঙ্গে জ্বালানি খরচ, পরিবহণের চাপ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে বড় শিল্পগোষ্ঠী
বলাগড় জেটি প্রকল্পকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বেসরকারি শিল্পমহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রোড শোয়ে দেশের একাধিক শীর্ষস্থানীয় শিল্প ও পরিকাঠামো সংস্থা অংশ নেয়। বিশেষভাবে আদানি গ্রুপ এবং জেএসডব্লিউ ইনফ্রাস্ট্রাকচার-সহ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলির আগ্রহ প্রকল্পটির সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ভবিষ্যতে এই আগ্রহ কতটা বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
রোড শোয়ে প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি
বিশেষ এই রোড শোয়ে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরের চেয়ারম্যান রথেন্দ্র রমন। প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে শিল্প প্রতিনিধিদের সামনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, বলাগড়ে একটি আধুনিক ও কার্যকর জলপথভিত্তিক পণ্য পরিবহণ কেন্দ্র গড়ে তুলে কলকাতা বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও বাড়ানো। একইসঙ্গে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-১-এর বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পণ্য পরিবহণে নতুন দিশার সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ জলপথকে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ওপর কেন্দ্রের পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষও জোর দিচ্ছে। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বলাগড় জেটি প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৫৩৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কলকাতা বন্দরের পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। কন্টেনার, কয়লা ও অন্যান্য বাল্ক পণ্য পরিবহণের পাশাপাশি কলকাতা শহরের ওপর সড়কপথের চাপ কমানো এবং হুগলি নদীপথকে আরও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বলাগড় জেটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
এখন বড় প্রশ্ন, আগ্রহ প্রকাশ করা শিল্পগোষ্ঠীগুলির মধ্যে কারা শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নে অংশ নেয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই উচ্চাভিলাষী জেটি প্রকল্প কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। তবে রোড শোয়ে শিল্পমহলের সাড়া দেখে বলাগড় প্রকল্পকে ঘিরে আশাবাদী বন্দর কর্তৃপক্ষ।
