বক্সায় এল ৩ বছরের রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনী, শুরু বাংলার প্রথম বাঘ পুনর্বাসন প্রকল্প
বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে ৩ বছরের রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পে আনা হল। ২ অক্টোবর প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে ছাড়ার পরিকল্পনা।
বাংলার প্রথম বাঘ পুনর্বাসন প্রকল্পে বড় সাফল্য, বক্সায় এল ৩ বছরের রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনী

সিটি নিউজ বাংলা ডেস্ক ৬ : বাংলার বাঘ সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি ৩ বছর বয়সী রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে সফলভাবে আলিপুরদুয়ারের বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলার প্রথম বাঘ পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই স্থানান্তরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বক্সা অরণ্যে দীর্ঘদিন পর বাঘের স্থায়ী ও প্রজননক্ষম জনসংখ্যা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই প্রথম পর্যায়ে বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে বাঘিনীটিকে বক্সায় নিয়ে আসা হয়েছে।
আকাশপথে বিশেষ ব্যবস্থায় বাঘিনীর যাত্রা
বাঘিনীটিকে প্রথমে বিশেষ পদ্ধতিতে ট্রাঙ্কুলাইজ করে নিরাপদে গোরক্ষপুর বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিশেষ কার্গো বিমানে করে তাকে উড়িয়ে আনা হয় হাসিমারা এয়ার ফোর্স স্টেশনে।
হাসিমারা থেকে শুরু হয় স্থলপথের যাত্রা। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বিশেষ গাড়িতে করে গ্রিন করিডরের মাধ্যমে বাঘিনীটিকে নিয়ে যাওয়া হয় বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পের নির্দিষ্ট এলাকায়।
পুরো যাত্রাপথেই বাঘিনীটির স্বাস্থ্যের উপর রাখা হয় বিশেষ নজর। দীর্ঘ যাত্রার সময় প্রতি ১০ মিনিট অন্তর তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও বন দফতরের কর্মীদের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়।
আপাতত ‘২৫ মাইল’-এর সফট-রিলিজ এনক্লোজারে
বক্সায় পৌঁছনোর পর বাঘিনীটিকে সরাসরি জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তাকে বক্সার ‘২৫ মাইল’ এলাকার একটি বিশেষ সফট-রিলিজ এনক্লোজারে রাখা হয়েছে।
নতুন পরিবেশের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতেই এই ব্যবস্থা। বক্সার আবহাওয়া, পরিবেশ ও জঙ্গলের পরিস্থিতির সঙ্গে বাঘিনীটি কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে বড় পদক্ষেপ
বাঘিনীটির পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আগামী ২ অক্টোবর ২০২৬, গান্ধী জয়ন্তীর দিন। ওই দিন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ২.২ হেক্টর প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে (Natural Enclosure) ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘিনীটির আচরণ, শারীরিক সক্ষমতা, খাদ্যাভ্যাস এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বক্সায় বাঘের স্থায়ী জনসংখ্যা তৈরির লক্ষ্য
বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং একটি স্থায়ী ও প্রজননক্ষম বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র নির্দেশিকা মেনে পুরো পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে।
বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যে বক্সায় আরও কয়েকটি বাঘ নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপে ধাপে বাঘের সংখ্যা বাড়িয়ে একটি সুস্থ ও স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বক্সার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে বাঘ সংরক্ষণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পর্যটনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা
বাঘিনীকে নিরাপদে বক্সায় নিয়ে আসা এবং পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যাতে কোনও ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য পর্যটকদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাঘিনী স্থানান্তর ও তার নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পে সমস্ত ধরনের জিপ সাফারি এবং পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই সময়ে বাঘিনীটির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং নতুন পরিবেশে অভিযোজনের উপরই প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলার বাঘ সংরক্ষণে নতুন অধ্যায়
বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে বক্সায় ৩ বছরের রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে নিয়ে আসার এই উদ্যোগ শুধু একটি বন্যপ্রাণী স্থানান্তর নয়, বরং বাংলায় বাঘ পুনর্বাসনের বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আগামী দিনে আরও বাঘ বক্সায় আনার মাধ্যমে প্রকল্পটি কীভাবে এগিয়ে যায়, সেদিকেই এখন নজর পরিবেশপ্রেমী, বন দফতর এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের।
