কোচবিহারে জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেস, জমা ৯৩টি প্রকল্প
কোচবিহারে ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের নির্বাচন, জমা পড়ল ৯৩টি প্রকল্প
৬৩টি প্রকল্পের উপস্থাপনা, প্রথমবার অংশগ্রহণ একাধিক বিদ্যালয়ের; বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে প্রথমবার প্রদান ‘বিজ্ঞান বন্ধু সম্মাননা’
কোচবিহার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, নিজস্ব সংবাদদাতা: শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, গবেষণার প্রবণতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কোচবিহার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল ৩২তম জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০২৬-২৭-এর কোচবিহার জেলা পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠান। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবছর মোট ৯৩টি প্রকল্প জমা পড়ে। তার মধ্যে ৬৩টি প্রকল্প উপস্থাপিত হয়। একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথমবার জেলা পর্যায়ের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।

তবে জমা পড়া সমস্ত প্রকল্প উপস্থাপিত হয়নি। শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের নির্ধারিত নিয়মাবলি ও প্রকল্প তৈরির নির্দেশিকা অনুসরণ করে প্রকল্প প্রস্তুত না হওয়ায় কয়েকটি প্রকল্প উপস্থাপনার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। এই অভিজ্ঞতা আগামী দিনে শিক্ষার্থী ও তাঁদের গাইড শিক্ষকদের আরও নিয়মমাফিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প তৈরিতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
কোচবিহার জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (ডিআই) অফিসের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে কোচবিহার অনাসৃষ্টি সংস্থা। শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের রাজ্য সমন্বয়কারী সংগঠন হিসেবে যুক্ত রয়েছে চাঁদপাড়া শিডিউল কাস্ট অ্যান্ড ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন।
বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের সূচনা
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (শিক্ষা) শ্রী রানা কর্মকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোচবিহারের জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক শ্রী প্রসূন বাঁচার, পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের ডি.ই.ও. শ্রীমতী দীপা চক্রবর্তী এবং বিজ্ঞানানুরাগী ব্যক্তিত্ব শ্রী মানস কর ও শ্রী বাসব দেবনাথ-সহ অন্যান্য বিশিষ্টজন।


সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে শিশু বিজ্ঞানী ও তাঁদের গাইড শিক্ষকদের রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়। রেজিস্ট্রেশন ডেস্কে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে ‘শিশু বিজ্ঞানী’ লেখা ব্যাজ পরিয়ে স্বাগত জানানো হয়। অতিথিদের বরণ করার ক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব ভাবনার পরিচয় দেয় কোচবিহার অনাসৃষ্টি। বিভিন্ন গাছের পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ পরিবেশবান্ধব ব্যাজের মাধ্যমে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হয়।

নির্বাচনপর্বের ভীতি কাটিয়ে শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে আয়োজক বিদ্যালয়ের মূল উদ্যানে তৈরি করা হয় ‘শিশু বিজ্ঞানী সেলফি জোন’। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতী শুচিস্মিতা চক্রবর্তী সেলফি তুলে এই উদ্যোগের শুভ সূচনা করেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এতে অংশ নেন।
প্রাক্তন শিশু বিজ্ঞানীদের হাত ধরে অতিথি বরণ
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কোচবিহার অনাসৃষ্টি সংস্থার সভাপতি ও শিক্ষিকা শ্রীমতী রুমা দে। আয়োজক বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালে জাতীয় স্তরে অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন শিশু বিজ্ঞানী মুন দাস ও পরিণীতা বর্মনের হাত ধরে অতিথি বরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
এরপর ভারতমাতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং বিচারকদের আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করা হয়। কোচবিহার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পরিবেশনায় জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’ অনুষ্ঠানে বিশেষ আবহ তৈরি করে।
এদিন মঞ্চে বরণ করে নেওয়া হয় এবছরের শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর শ্রী পলাশ নন্দী, শ্রী চিত্তরঞ্জন দত্ত, শ্রী কৃষ্ণেন্দু পাল ও শ্রী রিপন বিশ্বাসকে। এরপর অতিথিরা তাঁদের বক্তব্যে শিশুদের বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রথমবার ‘বিজ্ঞান বন্ধু সম্মাননা’ প্রদান
এবছর শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসে অংশগ্রহণের প্রসার এবং বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমবারের মতো প্রদান করা হয় ‘বিজ্ঞান বন্ধু সম্মাননা’। এই সম্মাননায় ভূষিত হন পুন্ডিবাড়ি জিডিএল বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতী রীতা ভট্টাচার্য।

শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিদ্যালয় স্তরে বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং আরও বেশি শিক্ষার্থীকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই সম্মাননা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
৬৩টি প্রকল্পের উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন
অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে মাস্টার কে.আর.পি. ড. তপন দাসের তত্ত্বাবধানে বিচারকরা প্রথম মূল্যায়ন কক্ষের ফিতা কেটে প্রকল্প নির্বাচনপর্বের সূচনা করেন।
জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশু বিজ্ঞানীরা নিজেদের প্রকল্পের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনী ভাবনা তুলে ধরে। মোট ৯৩টি প্রকল্প জমা পড়লেও উপস্থাপিত হয় ৬৩টি। একাধিক বিদ্যালয়ের প্রথমবার জেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণ এবছরের অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মধ্য দিয়ে জেলার আরও বেশি বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের সম্ভাবনা সামনে আসে।
অন্যদিকে, নির্ধারিত নিয়মাবলি অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তুত না হওয়ায় কয়েকটি প্রকল্প উপস্থাপিত হয়নি। এই বিষয়টি ভবিষ্যতে প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের নির্দেশিকা সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও গাইড শিক্ষকদের আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
প্রকল্প উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন পর্বে অংশগ্রহণকারী শিশু বিজ্ঞানী এবং তাঁদের প্রকল্প প্রশিক্ষকদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি শিশু বিজ্ঞানীদের জলখাবারও সরবরাহ করা হয়। প্রকল্প উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন পর্ব শেষে অংশগ্রহণকারী শিশু বিজ্ঞানী, প্রকল্প প্রশিক্ষক এবং বিচারকদের হাতে শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞানমনস্ক নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ
শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা, বিদ্যালয় স্তরে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা এবং বাস্তব সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজতে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে কোচবিহার জেলা পর্যায়ের এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একই সঙ্গে প্রথমবার অংশগ্রহণকারী বিদ্যালয়গুলির উপস্থিতি জেলার আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।
প্রতিবেদক: সুমন্ত সাহা
জেলা সমন্বয়কারী, জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০২৬-২৭
জেলা: কোচবিহার
