ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলন, বন্ধ ৫০০-র কাছাকাছি স্কুল
ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবাদে তীব্র ছাত্র আন্দোলন। শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের অভিযোগে প্রায় ৪০০-৫০০ স্কুলে ক্লাস বন্ধ।
ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিবাদে তীব্র ছাত্র আন্দোলন, বন্ধ ৫০০-র কাছাকাছি স্কুল!

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১১ : ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে বাড়ছে উত্তেজনা
ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে। রাজধানী প্যারিসের আশপাশ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যে নিরাপত্তাজনিত কারণে সোমবার, ৫ অক্টোবর, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি হাইস্কুলে পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে (Édouard Geffray) জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে পড়ুয়া ও শিক্ষক-কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সেই কারণেই বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কী কারণে শুরু এই ছাত্র আন্দোলন?
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দেশের একাধিক সরকারি স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে একেকটি শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত সংখ্যক পড়ুয়া থাকায় শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদের।
এর পাশাপাশি বহু স্কুলের ভবন, ছাদ ও অন্যান্য পরিকাঠামোর অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলির স্কুলগুলিতে শিক্ষক শূন্যপদ, ভিড় এবং পরিকাঠামোর সমস্যাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্যারিস থেকে একাধিক শহরে ছড়িয়েছে বিক্ষোভ
প্রথমে প্যারিস অঞ্চলে শুরু হলেও আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। মঁপেলিয়ে, নঁত, মার্সেই, লিলি, তুলুজ-সহ একাধিক বড় শহরে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। কোথাও স্কুলের সামনে অবস্থান, কোথাও রাস্তা অবরোধ এবং কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
শিক্ষার মান উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় কমানো এবং স্কুলের পরিকাঠামো সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা সরব হয়েছেন।
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত
শান্তিপূর্ণ দাবির পাশাপাশি আন্দোলনের বেশ কিছু জায়গায় সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের জেরে ২৪টি স্কুলে আগুন লাগানো বা ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার ঘটনাও দেখা গিয়েছে।
এখনও পর্যন্ত ৭৮ জন শিক্ষা দফতরের কর্মী আহত হয়েছেন বলে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন। এর ফলে স্কুলে পড়ুয়া ও শিক্ষক-কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
প্রায় ৫ হাজার গ্রেফতার, অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর প্রায় ৫,০০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই কিশোর-কিশোরী। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রশাসনের দাবি, হিংসা ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি রুখতে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি; অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের পদক্ষেপকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হিসেবে দেখছে।
আগামী দিনেও আন্দোলন চলার ডাক
ছাত্র সংগঠনগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনও আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির কয়েকটি অংশও বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। আগামী দিনে ফের বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
ফলে ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শুধু স্কুলকেন্দ্রিক বিক্ষোভে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষক সংকট, পরিকাঠামোর দুরবস্থা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় এবং শিক্ষা খাতে সরকারি নীতিকে ঘিরে ক্ষোভের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং ছাত্রদের দাবির কতটা সমাধান করা সম্ভব হয়, এখন সেদিকেই নজর দেশজুড়ে।
