জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে চতুর্থ দিনের বিক্ষোভ, সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ
CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে চতুর্থ দিনের বিক্ষোভ। SIR বিতর্কের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ, নজরে পরবর্তী শুনানি।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে চতুর্থ দিনের বিক্ষোভ, সুপ্রিম কোর্টে কমিশনকে নোটিশ

নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ৬ : ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে লাগাতার বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। তবে আদালত আপাতত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা তাঁর দায়িত্বে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়ার আবেদন গ্রহণ করেনি।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ মামলাটিতে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়ে নোটিশ জারি করেছে। ফলে আগামী দিনে এই মামলায় নির্বাচন কমিশনের জবাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
CEC-কে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ নয়
সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো অন্তর্বর্তী নির্দেশ চাওয়া হয়েছিল।
তবে আদালত এই পর্যায়ে এমন কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি। পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে জবাব চেয়েছে শীর্ষ আদালত। অর্থাৎ, মামলাটি এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না; বরং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী শুনানিতে আরও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হল, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীর মতামত বা সম্মতি উপেক্ষা করে তিনি এককভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত প্রায় ১০ মাসে কমিশনের বাকি দুই সদস্য ভোটার তালিকা সংশোধন, ফর্ম-৬ এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিকবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানানোর দাবি সামনে এসেছে।
এই অভিযোগ ঘিরেই নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজের পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
SIR ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক
বর্তমান বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision বা SIR প্রক্রিয়া। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে।
তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে বহু বৈধ ভোটার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে ভোটার তালিকার সংশোধনকে একটি নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা বাড়ছে এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদের কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
দিল্লিতে চতুর্থ দিনের বিক্ষোভ
CEC-এর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চতুর্থ দিনেও অব্যাহত রয়েছে। যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথে একাধিক রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মীদের আটক করার অভিযোগ উঠেছে।
কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি (AAP), অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) এবং অন্যান্য সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক দিনে কয়েকশো আন্দোলনকারীকে পুলিশ আটক করেছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
দিল্লির পাশাপাশি মুম্বই-সহ দেশের আরও কয়েকটি শহরেও এই ইস্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়েছে।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন
শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অনুমতি না দেওয়া নিয়েও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন আবেদনকারীরা।
যন্তর মন্তরে সাধারণ নাগরিক এবং সাংসদ-বিধায়কদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে পৃথক আবেদন করা হয়েছে। আদালত এই আবেদনটি আগামী সপ্তাহে তালিকাভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ফলে একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে মামলা চলছে, অন্যদিকে প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়েও আইনি লড়াইয়ের পরিধি বাড়ছে।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে আরও একটি তদন্তের দাবি
এর মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে আরও একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। কেরল সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতর ২০০৬ সালের একটি পুরনো PWD-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগের ঘটনায় দুর্নীতি দমন ব্যুরো বা VACB-কে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এই ঘটনাও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও কোনও অভিযোগ বা প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশকে চূড়ান্তভাবে অপরাধ প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। তদন্তের পরই অভিযোগগুলির সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পাওয়া সম্ভব হবে।
নজরে এখন সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানি
CEC জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক আন্দোলন, SIR নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
সুপ্রিম কোর্ট আপাতত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অন্তর্বর্তীভাবে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ না দিলেও নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চাওয়ায় মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। আগামী শুনানিতে কমিশনের বক্তব্য কী হয় এবং আদালত পরবর্তী কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।
