কোচবিহারে ভারত–নেপাল মৈত্রী সাইকেল যাত্রা, অংশ নিলেন নেপালের ১৩ প্রতিনিধি
কোচবিহারে ভারত–নেপাল মৈত্রী সাইকেল যাত্রায় অংশ নিলেন নেপালের ১৩ প্রতিনিধি। রাজবাড়ি থেকে শুরু এই অভিযানে উঠে এল কোচবিহারের ঐতিহ্য, স্থানীয় স্বাদ ও আতিথেয়তা।
কোচবিহারের ঐতিহ্যের পথে ভারত–নেপাল মৈত্রী সাইকেল যাত্রা, অংশ নিলেন নেপালের ১৩ প্রতিনিধি
ঐতিহ্য, পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও স্থানীয় আতিথেয়তার বার্তা নিয়ে কোচবিহারে আন্তর্জাতিক মৈত্রী অভিযান
কোচবিহার, ১৬ সেপ্টেম্বর, লোকাল ডেস্ক ৩: ভারত ও নেপালের বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করা, পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং কোচবিহারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কোচবিহারে অনুষ্ঠিত হল বিশেষ ভারত–নেপাল মৈত্রী সাইকেল যাত্রা। বুধবার সকালে কোচবিহার শহরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই সাইকেল যাত্রায় অংশ নেন নেপাল থেকে আগত ১৩ জন পর্যটক। তাঁদের মধ্যে নেপাল ট্যুরিজমের ৫ জন আধিকারিকও ছিলেন।

কোচবিহার সাইকেল কমিউনিটির উদ্যোগে এবং ইস্টার্ন ডুয়ার্স টুরিজম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (EDTDA) সহযোগিতায় আয়োজিত এই বিশেষ সাইকেল অভিযানের মাধ্যমে শহরের একাধিক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখেন নেপালের অতিথিরা। সাইকেলকে মাধ্যম করে পর্যটন, ঐতিহ্য, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং মানুষের আতিথেয়তাকে একসূত্রে বাঁধাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বুধবার সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ কোচবিহার রাজবাড়ি পার্ক থেকে মৈত্রী সাইকেল যাত্রার সূচনা হয়। যাত্রার শুরুতেই রাজবাড়ির সামনে আয়োজন করা হয় ‘Heritage Story Stop’। সেখানে কোচবিহার রাজবাড়ি, রাজপরিবার, রাজ আমলের ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য সম্পর্কে নেপাল থেকে আগত অতিথিদের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।

রাজবাড়ি থেকে সাইকেল যাত্রা এগিয়ে যায় বড়দেবী মন্দিরের দিকে। কোচবিহারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বড়দেবী মন্দিরের গুরুত্ব সম্পর্কে অতিথিদের জানানো হয়। এরপর ঐতিহাসিক সাগরদীঘি হয়ে যাত্রা পৌঁছয় মদনমোহন বাড়ির দিকে।
সাগরদীঘির কাছে রাখা হয়েছিল বিশেষ ‘Local Taste Stop’। সেখানে নেপাল থেকে আসা পর্যটকদের স্থানীয় খাবারের স্বাদের সঙ্গে পরিচিত করানো হয়। কোচবিহারের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি এবং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা দেওয়ার মাধ্যমে এই পর্বটি মৈত্রী যাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

এরপর সাইকেল যাত্রা পৌঁছয় মদনমোহন বাড়িতে। সেখানে ছিল Drinking Water Stop এবং আরও একটি Heritage Story Stop। মদনমোহন মন্দির, কোচবিহারের রাজপরিবার এবং শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে অতিথিদের অবহিত করা হয়।
মৈত্রী যাত্রার পরবর্তী গন্তব্য ছিল বড় পোস্ট অফিস এলাকা। পুরনো কোচবিহারের নগর পরিকল্পনা, প্রশাসনিক ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে সেখানে আয়োজন করা হয় আরও একটি Heritage Story Stop। সাইকেলের মাধ্যমে শহরের পরিচিত স্থানগুলিকে নতুনভাবে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার এই উদ্যোগে কোচবিহারের অতীত ও বর্তমানের একটি সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়।
এরপর সাইকেল আরোহীরা পুলিশ লাইন হয়ে কলাবাগান চৌপথী এলাকায় পৌঁছন। পূর্বনির্ধারিত Breakfast Stop-এর পরিবর্তে সেখানে স্থানীয় আতিথেয়তার একটি বিশেষ আয়োজন করা হয়। কোচবিহার সাইকেল কমিউনিটির সাইকেল আরোহী বেবি আগারওয়াল ও রাজেশ আগারওয়ালের বাড়িতে গণপতি উৎসব উপলক্ষে নেপাল থেকে আগত অতিথিদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয় পরিবারের বাড়িতে এই আপ্যায়ন দুই দেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি আন্তরিক ছবি তুলে ধরে। ‘অতিথি দেব ভব’ ভাবনাকে সামনে রেখে নেপালি অতিথিদের খাবার পরিবেশন করা হয়। এর মাধ্যমে তাঁরা শুধু কোচবিহারের দর্শনীয় স্থানই নয়, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং আন্তরিক আতিথেয়তার সঙ্গেও সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় মৈত্রী সাইকেল যাত্রার সমাপনী পর্ব। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ভারত ও নেপালের জাতীয় পতাকা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের বার্তা তুলে ধরা হয়। পরে অংশগ্রহণকারী সাইকেল আরোহী, নেপাল থেকে আগত পর্যটক, ট্যুরিজম আধিকারিক এবং আয়োজকদের নিয়ে যৌথভাবে Group Photo তোলা হয়।
ইস্টার্ন ডুয়ার্স টুরিজম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, “ইন্দো-নেপাল ট্যুরিজম নিয়ে দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করা এবছরের আয়োজনের অন্যতম কর্মসূচি ছিল কোচবিহারে সাইকেলে ভ্রমণ। এই ভ্রমণের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোগে কোচবিহারকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার একটি প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনগুলিতে এই Heritage Cycling Ride এগিয়ে চললে EDTDA পাশে থাকবে।”
কোচবিহার সাইকেল কমিউনিটির সাইকেল আরোহী সুমন্ত সাহা জানান, “এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র একটি সাইকেল রাইড হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। সাইকেলকে মাধ্যম করে কোচবিহারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার, মানুষের আতিথেয়তা এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে তুলে ধরাই ছিল এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।”
পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেও এই উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গাড়ি বা অন্য কোনও দূষণকারী পরিবহণের পরিবর্তে সাইকেলকে পর্যটনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ঐতিহাসিক শহরকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করা হয়। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছেছে, অন্যদিকে পর্যটকদের সামনে শহরের অলিগলি, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং স্থানীয় জীবনের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যতে কোচবিহারের ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারকে সাইকেলভিত্তিক পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘Cooch Behar Heritage Cycling Experience’ গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ নিয়মিতভাবে আয়োজন করা গেলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে কোচবিহারকে আরও নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা সম্ভব বলেও মনে করছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে, বুধবারের ভারত–নেপাল মৈত্রী সাইকেল যাত্রা শুধু দুই দেশের পর্যটক ও সাইকেলপ্রেমীদের একসঙ্গে পথচলা নয়; বরং ঐতিহ্য, পরিবেশ, পর্যটন ও মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে ভারত–নেপাল বন্ধুত্বের এক বিশেষ উদযাপন হয়ে উঠল।
‘প্যাডেল ঘোরাও, প্রকৃতি বাঁচাও’—এই বার্তাকে সামনে রেখে কোচবিহারের রাজবাড়ি থেকে শুরু হওয়া এই সাইকেল যাত্রা শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে পৌঁছে দিল দুই দেশের মানুষের মৈত্রীর এক উষ্ণ বার্তা।
