মহালয়ায় ইডেনে ৩,০০০ ঢাকি ও ড্রোন শো, বর্ণাঢ্য উৎসব কলকাতায়
মহালয়ায় ইডেন গার্ডেন্সে ৩,০০০ ঢাকির সমবেত বাদ্যি, ৩,০০০ ড্রোনের শো, লেজার প্রদর্শনী ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে দেবীপক্ষের সূচনা উদযাপন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
মহালয়ায় ইডেন গার্ডেন্সে বর্ণাঢ্য উৎসব! ৩,০০০ ঢাকির সমবেত বাদ্যি, ড্রোন শো

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৮ : মহালয়ার পুণ্যলগ্নে ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা উদযাপন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ঢাকের তালে, আলোর রোশনাইয়ে, ড্রোনের চোখধাঁধানো প্রদর্শনী এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মেলবন্ধনে সেজে উঠেছিল কলকাতার এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম। অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল একসঙ্গে ৩,০০০ ঢাকির সমবেত বাদ্যি এবং প্রায় ৩,০০০ ড্রোনের বিশেষ প্রদর্শনী। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল।
৩,০০০ ঢাকির বাদ্যে বিশ্বরেকর্ড গড়ার দাবি
মহালয়ার অনুষ্ঠানে বাংলার দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ঢাককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একসঙ্গে ৩,০০০ ঢাকির সমবেত পরিবেশনা অনুষ্ঠানের আবহকে আরও উৎসবমুখর করে তোলে। ঢাকের তালে স্টেডিয়ামজুড়ে তৈরি হয় দেবীর আগমনের আবহ। উপস্থিত দর্শকদের কাছে এই পরিবেশনা ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।
এই সমবেত পরিবেশনাকে ঘিরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তবে নতুন বিশ্বরেকর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি যাচাই করা প্রয়োজন।
আকাশজুড়ে ৩,০০০ ড্রোনের মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী
অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল প্রায় ৩,০০০ ড্রোনের বিশেষ শো। আকাশের বুকে আলোর সাহায্যে দেবীর রূপ ও আগমনী বার্তা ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনায় এই প্রদর্শনী দর্শকদের নজর কাড়ে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে বাঙালির চিরাচরিত দুর্গোৎসবের আবেগকে এক মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
ড্রোন শোয়ের পাশাপাশি ছিল থ্রি-ডি প্রজেকশন ম্যাপিং, লেজার শো এবং আতশবাজির প্রদর্শনী। আলো, শব্দ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ইডেন গার্ডেন্সের পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। ঐতিহ্যবাহী ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে আধুনিক আলোকসজ্জার এই মেলবন্ধন অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে।
শঙ্খের প্রতিরূপ ও আলপনায় সেজে ওঠে ইডেন
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে স্টেডিয়ামের মাঠে তৈরি করা হয় বিশাল শঙ্খের প্রতিরূপ। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী আলপনার নকশায় সাজানো হয় অনুষ্ঠানস্থল। দুর্গাপুজোর আবহ, বাংলার শিল্পকলা এবং আধুনিক মঞ্চসজ্জার সমন্বয়ে গোটা আয়োজনকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। বিপুল সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে ইডেন গার্ডেন্স কার্যত উৎসবের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।
গঙ্গার ঘাটে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন তর্পণ
মহালয়ার সকালে কলকাতার গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করতে বহু মানুষ উপস্থিত হন। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, মহালয়ার দিন পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে তর্পণ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সেই প্রথা মেনেই ভোর থেকে ঘাটগুলিতে ভিড় জমে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানানো তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার ঘাটগুলিতে তর্পণ অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং বড় ধরনের কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভিড় সামলানো, ঘাট পরিষ্কার রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরসভা ও পুলিশ প্রশাসনের তরফে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
জলপথে নজরদারির জন্য পুলিশি লঞ্চ ও বোট ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘাটগুলির পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
শাস্ত্র ও সনাতনী ঐতিহ্য মেনেই দেবীপক্ষের সূচনা
ইডেন গার্ডেন্সের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও দুর্গাপুজোর রীতিনীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, শাস্ত্রে উল্লিখিত বিধান এবং সনাতনী ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনেই দেবীপক্ষে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়েছে।
বাংলার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি রাজ্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুজোকে কেন্দ্র করে শিল্পী, ঢাকি, মৃৎশিল্পী, আলোকসজ্জার কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। সেই কারণে দুর্গোৎসবের সূচনাকে ঘিরে এই ধরনের বৃহৎ আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নতুন ১২,৪০০টি দুর্গাপুজো কমিটিকে অনুমোদন, অনুদানের ঘোষণা
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর রাজ্যে আরও ১২,৪০০টি নতুন দুর্গাপুজো কমিটি অনুমোদন পেয়েছে। অনুমোদিত সমস্ত কমিটিকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনুদান দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
নতুন পুজো কমিটির অনুমোদন এবং সরকারি অনুদানের ঘোষণা রাজ্যের দুর্গোৎসবের পরিসর নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে অনুদানের নির্দিষ্ট অঙ্ক, বিতরণের সময়সীমা এবং অনুমোদিত কমিটির মোট সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে মহালয়ার উদযাপন
মহালয়া বাঙালির কাছে দেবীপক্ষের আগমনী বার্তা। ভোরের মহিষাসুরমর্দিনী পাঠ, গঙ্গার ঘাটে তর্পণ, ঢাকের আওয়াজ এবং দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আবেগ।
সেই আবেগকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৃহৎ আয়োজনের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেল ইডেন গার্ডেন্সের অনুষ্ঠানে। একদিকে ৩,০০০ ঢাকির সমবেত বাদ্যি, অন্যদিকে ড্রোন, লেজার ও প্রজেকশন শো—সব মিলিয়ে মহালয়ার উদযাপনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা।
সবশেষে, বাংলার ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই অনুষ্ঠান দেবীপক্ষের সূচনাকে কেন্দ্র করে এক বর্ণাঢ্য উৎসবের আবহ তৈরি করে। দুর্গাপুজোর আগে এমন আয়োজন রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি উৎসবের প্রস্তুতিকেও আরও জোরদার করেছে।
