হারিয়ে যাচ্ছে চেনা চড়ুই! শহরের কংক্রিটে কেন কমছে ছোট্ট প্রতিবেশী?
শহরের কংক্রিটে কেন কমছে চড়ুই? নগরায়ণ, বাসস্থান ও খাদ্যের সংকট, কীটনাশকসহ বিভিন্ন কারণ এবং চড়ুই সংরক্ষণে কী করতে পারেন, জানুন বিস্তারিত।
হারিয়ে যাচ্ছে চেনা চড়ুই, শহরের কংক্রিটে কোথায় হারাল আমাদের ছোট্ট প্রতিবেশী?

সিটি নিউজ বাংলা, কোচবিহার: একসময় সকাল মানেই ছিল জানালার পাশে চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। ঘুম ভাঙার আগেই উঠোন, বারান্দা কিংবা কার্নিশে ছোট্ট পাখিদের ব্যস্ত আনাগোনা চোখে পড়ত। কখনও জানালার গ্রিলে বসে ডাক, কখনও ঘরের ছাদের কোণে বাসা তৈরির চেষ্টা, আবার কখনও একে অপরের সঙ্গে খাবার নিয়ে ছোটাছুটি। শহর ও গ্রামবাংলার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে চড়ুই যেন অদৃশ্য এক সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা ছিল।

কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে আমাদের শহর, বাড়িঘর এবং জীবনযাত্রা। চারপাশে বেড়েছে কংক্রিটের নির্মাণ, কমেছে পুরনো গাছ, ঝোপঝাড় ও খোলা জায়গা। আধুনিক বাড়িতে আগের মতো কার্নিশ, ফাঁকফোকর কিংবা এমন জায়গাও কমে এসেছে যেখানে চড়ুই নিরাপদে বাসা তৈরি করতে পারে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে পোকামাকড় ও প্রাকৃতিক খাবারের উৎসও।
ফলে অনেকের কাছেই এখন চড়ুইয়ের ডাক হয়ে উঠেছে অতীতের স্মৃতি।
কেন কমছে চড়ুই?
চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণকে দায়ী করা যায় না। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিবেশবিদদের আলোচনায় বাসস্থান হারানো, খাদ্যের সংকট, কীটনাশকের ব্যবহার, দূষণ, নগরায়ণ এবং প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশের অভাবের মতো একাধিক কারণ উঠে এসেছে।
বিশেষ করে দ্রুত নগরায়ণের ফলে ছোট পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। আগে যে বাড়ির কার্নিশ, টালির চাল কিংবা পুরনো দেওয়ালের ছোট ফাঁকে চড়ুই বাসা বাঁধত, আধুনিক নির্মাণে সেই সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই আর থাকছে না।
অন্যদিকে কৃষি ও বাগানে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার পোকামাকড়ের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে। চড়ুইসহ বহু ছোট পাখির খাদ্যচক্রে এই পোকামাকড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে খাদ্যের উৎস কমে গেলে তার প্রভাব পাখিদের ওপরও পড়তে পারে।
মোবাইল টাওয়ারই কি একমাত্র কারণ?
চড়ুই কমে যাওয়ার আলোচনায় মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণকে অনেক সময় প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে মোবাইল টাওয়ারকে চড়ুই কমে যাওয়ার একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে দায়ী করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। চড়ুইয়ের সংখ্যা কমার বিষয়টি অনেক বেশি জটিল এবং এর সঙ্গে পরিবেশগত ও নগরায়ণজনিত একাধিক পরিবর্তন জড়িত।
তাই কারণ খুঁজতে গিয়ে একটি মাত্র বিষয়কে দায়ী করার বদলে আমাদের সামগ্রিক পরিবেশের পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কোচবিহারেও কি বদলাচ্ছে চড়ুইয়ের পরিচিত জগত?
কোচবিহারের মতো তুলনামূলকভাবে সবুজ শহরেও দ্রুত বদলে যাচ্ছে বসতি ও নির্মাণের ধরন। পুরনো বাড়ির জায়গায় তৈরি হচ্ছে নতুন বহুতল ও আধুনিক স্থাপনা। অনেক জায়গায় কেটে যাচ্ছে পুরনো গাছ, কমছে ঝোপঝাড় ও ছোট জলাশয়ের পরিসর। ফলে মানুষের পাশাপাশি ছোট পাখিদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আসছে।
যদিও স্থানীয়ভাবে চড়ুইয়ের সংখ্যা নিয়ে নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গণনা না থাকলে নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন যে কোচবিহারে কত শতাংশ চড়ুই কমেছে। তবে পরিবেশের পরিবর্তন যে ছোট পাখিদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
আমরা কী করতে পারি?
চড়ুই সংরক্ষণের জন্য সবসময় বড় কোনও উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। বাড়ির ছোট্ট বারান্দা থেকেই শুরু হতে পারে পরিবর্তন।
বাড়ির নিরাপদ জায়গায় একটি ছোট পাত্রে পরিষ্কার জল রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি উপযুক্ত দানা বা খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। সম্ভব হলে বারান্দা, জানালা কিংবা ছাদের এমন জায়গায় ছোট্ট বার্ড নেস্ট বক্স রাখা যেতে পারে যেখানে পাখিরা নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে।
তবে খাবার বা জল দেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। জল নিয়মিত বদলাতে হবে এবং খাবারের পাত্র পরিষ্কার রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাখিদের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া। বাড়ির আশেপাশে গাছ লাগানো, স্থানীয় প্রজাতির গাছ রক্ষা করা, অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং ছোট সবুজ জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা হলে শুধু চড়ুই নয়, আরও বহু পাখি উপকৃত হবে।
আগামী প্রজন্ম কি চড়ুইকে শুধু ছবিতে দেখবে?
প্রশ্নটা তাই শুধু একটি পাখিকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আমাদের চারপাশের পরিবেশ নিয়ে।
যে চড়ুই একসময় আমাদের জানালার ধারে এসে সকাল শুরু করত, সে যদি ধীরে ধীরে আমাদের শহর থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে তার সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের পরিচিত এক টুকরো শৈশব, এক টুকরো প্রকৃতি।
আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চাই, যেখানে শিশুরা চড়ুইকে বাস্তবে নয়, শুধু বইয়ের ছবি কিংবা মোবাইলের পর্দায় দেখবে?
উত্তরটা আমাদের হাতেই।
আজ আপনার বাড়ির পাশে যদি একটি চড়ুই এসে বসে, তাকে তাড়িয়ে দেবেন না। একটু জল রাখুন, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন, সম্ভব হলে কিছু দানা দিন। বাড়ির আশেপাশের একটি গাছও রক্ষা করুন।
কারণ প্রকৃতিকে বাঁচানোর বড় কাজগুলো অনেক সময় শুরু হয় খুব ছোট্ট একটি উদ্যোগ থেকেই।
একটি জলপাত্র, একটি বাসার জায়গা, একটি গাছ।
হয়তো এই ছোট্ট কাজগুলিই আবার ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যেতে বসা চড়ুইয়ের পরিচিত ডাক।
এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিন। আপনার একটি শেয়ার হয়তো আরও একজন মানুষকে নিজের বাড়ির বারান্দায় একটি চড়ুইয়ের জন্য জায়গা করে দিতে উৎসাহিত করবে।
চড়ুই বাঁচুক, পাখি বাঁচুক, প্রকৃতি বাঁচুক।
