শিক্ষাজ্যোতি সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন গোপালপুরের প্রধান শিক্ষক ড. তপন দাস
গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. তপন দাস বিজ্ঞানচর্চা, শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিতে ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মান পেতে চলেছেন।
‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. তপন দাস
বিজ্ঞানচর্চা, শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি
কোচবিহার, CT News বাংলা: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আজকের সময়ে নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ঘটনায় সেই সম্পর্কের টানাপোড়েনের ছবি প্রায়ই সামনে আসে। এমন এক সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে চলেছেন কোচবিহার ২ নম্বর ব্লকের গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. তপন দাস।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান, বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে নানা উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মানে ভূষিত হতে চলেছেন ড. তপন দাস।

বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসেবে বহুমুখী পরিচয়
ড. তপন দাস M.Sc., B.Ed. এবং Ph.D. ডিগ্রিধারী। তাঁর গবেষণার বিষয় পলিমার রসায়ন। আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ১৮টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে শতাধিক বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ।
বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর কলমে প্রকাশিত হয়েছে ‘রসনার রসায়ন’ এবং ‘অনুঘটকের তৃতীয় স্তম্ভ’ নামে দুটি বই।
তবে তাঁর আগ্রহ শুধুমাত্র বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তরাই-ডুয়ার্সের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিও তাঁর গভীর আকর্ষণ রয়েছে। এই অঞ্চলের গ্রামগঞ্জ ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে যৌথভাবে তিনি লিখেছেন ‘তরাই ডুয়ার্সের মন্দির’ বইটি।

বিদ্যালয়কে আনন্দময় শিক্ষাঙ্গন করে তোলার প্রয়াস
গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ড. তপন দাস শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়কে আনন্দময় ও সৃজনশীল শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের উপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে বক্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন, হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহ, বাস্তব প্রয়োগভিত্তিক গণিত শিক্ষা এবং সহজ পদ্ধতিতে গণিত শেখানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণিতের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বাড়াতে বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় ‘গণিত ভাবনায় গণিত মেলা’। পাশাপাশি চিত্রের মাধ্যমে সাহিত্যকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার অভিনব প্রয়াসও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ে রয়েছে শিশু সংসদ, কন্যাশ্রী ক্লাব, ইকো ক্লাব এবং রাইটার্স ক্লাব। এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
‘সততা কর্ণার’ থেকে ‘মনের কথা বল’
স্বল্প পরিকাঠামোর মধ্যেও বিদ্যালয়ে রয়েছে সায়েন্স ল্যাব, ভূগোল পরীক্ষাগার এবং রিডিং রুম।
শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে রয়েছে ‘সততা কর্ণার’, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাতা, কলম, পেনসিল ইত্যাদি সততার সঙ্গে সংগ্রহ করতে পারে। রয়েছে ‘সরস্বতীর ডালা’, যেখান থেকেও প্রয়োজনের সময়ে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে পারে।
শুধু শিক্ষার বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের মনের কথাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে রয়েছে ‘মনের কথা বল’ বাক্স। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অনুভূতি, সমস্যা কিংবা মনের কথা লিখে জানাতে পারে।
মানসিক সুস্থতা ও জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করতে বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রয়েছে ‘নলেজ কর্ণার’ এবং ‘জানা-অজানা কর্ণার’।
প্রকৃতি ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা
বিদ্যালয়ে তৈরি করা হয়েছে ভেষজ উদ্যান ও ছাদবাগান। শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্ভিদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
তুলসী চা পরিবেশন কিংবা ব্রাহ্মী শাক দিয়ে তৈরি খাবারের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্থানীয় উদ্ভিদ, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি সারা বছর ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন কো-কারিকুলার কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়।
জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রায় ১৫ বছরের ভূমিকা
ড. তপন দাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও শিক্ষামূলক ভূমিকা রয়েছে জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলার ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও প্রকল্পে উৎসাহিত করে চলেছেন।
তাঁর লক্ষ্য, জেলার মেধাবী ও কৌতূহলী ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে জাতীয় স্তরের মঞ্চে পৌঁছে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন করার মানসিকতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
“একজন প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি করেন”
ড. তপন দাসের ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মানপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে কোচবিহার শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা সমন্বয়কারী সুমন্ত সাহা বলেন,
«“ড. তপন দাস মহাশয়কে ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মানে সম্মানিত করা হচ্ছে, এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের জেলা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।”»
তিনি আরও বলেন,
«“ড. তপন দাস শুধু ছাত্রছাত্রীদের বইয়ের জ্ঞান দিতে চান না। তিনি তাঁদের প্রশ্ন করতে শেখান, ভাবতে শেখান এবং নিজেদের চারপাশের সমস্যাকে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে উৎসাহিত করেন। একটি শিশুর ছোট্ট কৌতূহলকে কীভাবে বিজ্ঞান প্রকল্পের ভাবনায় পরিণত করা যায় এবং তাকে জাতীয় স্তরের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই জায়গায় তাঁর আন্তরিকতা ও পরিশ্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”»
সুমন্ত সাহার কথায়, “আজকের দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন ড. তপন দাসের মতো শিক্ষকরা আমাদের মনে করিয়ে দেন, একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি করেন।”
তিনি বলেন, “তাঁর বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ, বিশেষ করে ‘মনের কথা বল’, সায়েন্স ল্যাব, রিডিং রুম, ইকো ক্লাব, রাইটার্স ক্লাব, গণিত মেলা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।”
শুধু সম্মান নয়, অনুপ্রেরণারও স্বীকৃতি
শিক্ষকতা, বিজ্ঞান গবেষণা, লেখালেখি, লোকসংস্কৃতি চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে ড. তপন দাসের ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মানপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে তাঁদের চিন্তা, সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার যে প্রয়াস তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটিই তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
কোচবিহার শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেস পরিবারের পক্ষ থেকে ড. তপন দাস মহাশয়কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জেলা সমন্বয়কারী সুমন্ত সাহা।
তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাদর্শ আগামী প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের আরও বহুদিন অনুপ্রাণিত করবে, এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত সকলের।
প্রতিবেদন: CT News বাংলা
