সিন্ধু জলচুক্তি: PCA-র রায় প্রত্যাখ্যান ভারতের, পাকিস্তানকে কড়া বার্তা
সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ফের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। PCA-র রায় প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি স্থগিত রাখার অবস্থানে অনড় নয়াদিল্লি।
সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ফের তীব্র সংঘাত! PCA-র রায় প্রত্যাখ্যান এবং কড়া বার্তা নয়াদিল্লির
পাকিস্তানের ‘আইনি জয়’-এর দাবি, গঠনমূলক আলোচনায় বসার আহ্বান; পহেলগাঁও হামলার পর চুক্তি স্থগিত রাখার অবস্থানে অনড় ভারত

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ৮ : সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও আইনি সংঘাত আরও তীব্র হল। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের স্থায়ী সালিসি আদালত (PCA) ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিলেও সেই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লির স্পষ্ট বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সালিসি আদালতের এই বিষয়ে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও নির্দেশ দেওয়ার আইনি এক্তিয়ারই নেই।
গত ৩১ আগস্ট, ২০২৬-এর সিদ্ধান্তে PCA জানায়, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু জলচুক্তি ‘স্থগিত’ বা ‘Abeyance’-এ রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কোনও আইনি ভিত্তি নেই এবং চুক্তিটি এখনও কার্যকর। একইসঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির কয়েকটি বিষয় নিয়েও আদালত নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এই রায়কে আমল দিতে নারাজ ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, যে প্রক্রিয়ায় এই সালিসি আদালত গঠিত হয়েছে, সেটিই চুক্তির নির্ধারিত বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ওই আদালতের কোনও সিদ্ধান্ত ভারতের উপর বাধ্যতামূলক নয়।
🇵🇰 পাকিস্তানের ‘আইনি জয়’-এর দাবি
PCA-র সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে বড় কূটনৈতিক ও আইনি সাফল্য হিসেবে দেখছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের বক্তব্য, ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারত একতরফাভাবে সেটিকে স্থগিত রাখতে পারে না।
পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি ভারতকে চুক্তির কাঠামোর মধ্যে ফিরে এসে গঠনমূলক আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দুই দেশের মধ্যে জল সংক্রান্ত সমস্যাগুলি চুক্তির নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন।
বুধবার পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তির পরিকাঠামোর অধীনে গঠনমূলক আলোচনা চায়।
💧 কী বলেছে দ্য হেগের আদালত?
PCA-র সিদ্ধান্তে মূলত বলা হয়েছে, সিন্ধু জলচুক্তি এখনও বলবৎ রয়েছে। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চুক্তির কার্যকারিতা শেষ বা স্থগিত হয়ে যায়নি।
এছাড়াও জম্মু-কাশ্মীরের রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তে প্রকল্পের বাঁধের নির্দিষ্ট অংশ এবং জল নেওয়ার কাঠামোর নির্মাণ নিয়ে বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে।
চুক্তির সঙ্গে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সামঞ্জস্য নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ও সামনে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি চুক্তির শর্ত মেনে চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখবেন বলে জানানো হয়েছে।
🇮🇳 ভারতের কড়া অবস্থান—‘আদালতের এক্তিয়ার নেই’
PCA-র সিদ্ধান্ত সামনে আসার পরই ভারতের বিদেশ মন্ত্রক কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই রায় নয়াদিল্লির অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আনছে না।
ভারতের দাবি, সংশ্লিষ্ট সালিসি প্রক্রিয়া চুক্তির নির্ধারিত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই এই আদালতের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
নয়াদিল্লির মতে, আদালতটির গঠনই যখন প্রশ্নের মুখে, তখন তার কোনও নির্দেশ ভারতের উপর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে না। ভারত আগেও এই সালিসি প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে দাবি করেছে এবং জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় দেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত ভারতের কাছে আইনি প্রভাব বহন করে না।
💥 পহেলগাঁও হামলার পর কেন চুক্তি স্থগিত করেছিল ভারত?
সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারতের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে ২০২৫ সালের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলা। ওই হামলার পর ভারতের ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS) সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
নয়াদিল্লির অবস্থান হল, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদদ ও অর্থায়ন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
অর্থাৎ, ভারতের কাছে বিষয়টি শুধুমাত্র জলবণ্টন বা কোনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদও সরাসরি যুক্ত।
🤝 দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পক্ষেই ভারত
ভারত বরাবরই বলে আসছে, সিন্ধু জলচুক্তি সংক্রান্ত কোনও প্রযুক্তিগত বা বাস্তব সমস্যা হলে তার সমাধান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং চুক্তিতে নির্ধারিত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
নয়াদিল্লি তৃতীয় কোনও পক্ষ বা আন্তর্জাতিক সালিসি ব্যবস্থার হস্তক্ষেপকে গ্রহণ করতে চাইছে না। ফলে পাকিস্তান যখন PCA-র সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন ভারত সেই আদালতের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
⚠️ আরও বাড়ছে ভারত-পাক জল উত্তেজনা
সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এবং PCA-র সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে। অন্যদিকে ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ওই সালিসি আদালতের সিদ্ধান্ত মানছে না এবং চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে।
ফলে কাগজে-কলমে PCA-র সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে সুবিধা দিলেও বাস্তবে তার প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে জলসম্পদকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক টানাপড়েন আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন—ভারত ও পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসবে, নাকি আন্তর্জাতিক আইনি মঞ্চকে ঘিরে এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হবে? সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে দুই দেশের অনড় অবস্থানের কারণে আগামী দিনগুলিতে এই জল-রাজনীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সিটি নিউজ বাংলা | নয়াদিল্লি
