অন্নপূর্ণা যোজনার বাজেট ৪৮ হাজার কোটি, টাকা না পেয়ে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ
অন্নপূর্ণা যোজনার বাজেট ৩৬ হাজার থেকে বেড়ে ৪৮ হাজার কোটি। টাকা না পেয়ে রাজ্যজুড়ে মহিলাদের বিক্ষোভ, রেল ও পথ অবরোধ। জানুন বিস্তারিত।
অন্নপূর্ণা যোজনার বাজেট ৪৮ হাজার কোটি, তবু টাকা না পেয়ে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ
সিটি নিউজ বাংলা, স্টেট ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের অন্যতম আলোচিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প অন্নপূর্ণা যোজনা ঘিরে রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। প্রকল্পের বাজেট ৩৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা করার ঘোষণা হলেও বহু মহিলা এখনও অনুদানের টাকা হাতে পাননি বলে অভিযোগ। টাকা পেতে দেরি, যাচাইয়ের নামে নাম বাদ পড়া এবং উপভোক্তার সংখ্যা কমে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ, পথ অবরোধ, রেল অবরোধ এবং প্রশাসনিক দফতর ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটেছে।

নতুন প্রকল্পের আওতায় যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে পথে নেমেছেন বহু মহিলা।
৩৬ হাজার থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা বাজেট
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ধনধান্য অডিটোরিয়াম থেকে অন্নপূর্ণা যোজনার বাজেট বৃদ্ধির ঘোষণা করেছেন বলে জানা গিয়েছে। প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মোট বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের দাবি, যোগ্য মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করতে এবং তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
তবে বাজেট বৃদ্ধির পরেও কেন বহু উপভোক্তা টাকা পাচ্ছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
উপভোক্তার সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক
অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তার সংখ্যা নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। অভিযোগ, আগের সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের তুলনায় বর্তমান প্রকল্পে উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ কমেছে।
বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বহু আবেদনকারীর নাম যাচাই-বাছাইয়ের পর বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করলেই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে। শুধুমাত্র আবেদন করলেই প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে না।
টাকা না পেয়ে রাস্তায় মহিলারা
প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় মহিলারা বিক্ষোভে নেমেছেন। কোথাও প্রশাসনিক অফিস ঘেরাও করা হয়েছে, কোথাও আবার রেল ও সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটি ও হাবড়ায় রেললাইন অবরোধের জেরে শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়। অন্যদিকে হুগলি এবং কলকাতার ডায়মন্ড হারবার রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও মহিলাদের পথ অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।
BDO ও SDO অফিস ঘেরাও
শুধু রেল ও সড়ক অবরোধ নয়, বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরেও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন উপভোক্তারা।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর, জামুড়িয়া এবং বেহালার BDO ও SDO অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখানোর খবর সামনে এসেছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁরা প্রকল্পের জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অ্যাকাউন্টে টাকা আসছে না। কেউ কেউ আবেদন করার পরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছেন বলে দাবি করেছেন। আবার অনেকের অভিযোগ, যাচাই-বাছাইয়ের সময় তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীর সামনেও ক্ষোভ
পশ্চিম মেদিনীপুরে বৈঠক করতে গিয়ে বিক্ষোভকারী মহিলাদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলে জানা গিয়েছে।
মহিলাদের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাসিক ৩ হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকে টাকা পাচ্ছেন না। ফলে সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা।
তৃণমূলের তীব্র আক্রমণ
অন্নপূর্ণা যোজনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে বহু মহিলা টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তৃণমূলের দাবি, আগের সরকারের আমলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা নিয়মিত উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যেত। বর্তমান সরকারের প্রকল্পে টাকা পেতে দেরি এবং উপভোক্তার সংখ্যা কমে যাওয়াকে তারা সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন নানা যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, যোগ্য কেউ বঞ্চিত হবেন না
বিরোধীদের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে যে বিক্ষোভ হচ্ছে, তার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
ভবানীপুরের একটি কর্মসূচি থেকে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে ‘অন্নপূর্ণা দিবস’ পালন করা হবে। তাঁর দাবি, প্রকল্পের যোগ্য কোনও আবেদনকারীকে বঞ্চিত করা হবে না।
সরকারের বক্তব্য, আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।
পঞ্চায়েত মন্ত্রীর পাল্টা কটাক্ষ
বিক্ষোভ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ আগের তৃণমূল সরকারের নীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, আগের সরকার ঢালাওভাবে সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, অন্নপূর্ণা যোজনার নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া রয়েছে। সেই মানদণ্ড পূরণ করেন এমন আবেদনকারীরাই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
উৎসবের আগে চাপ বাড়ছে সরকারের উপর
সামনেই দুর্গাপুজো। তার আগে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে রাজ্যজুড়ে মহিলাদের ধারাবাহিক বিক্ষোভ নতুন সরকারের উপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়াচ্ছে।
একদিকে সরকার বাজেট বাড়িয়ে প্রকল্পের পরিধি বিস্তারের দাবি করছে, অন্যদিকে উপভোক্তাদের একাংশ টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামছেন। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক।
এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হল—যোগ্য উপভোক্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাঁদের অ্যাকাউন্টে অনুদানের টাকা পৌঁছে দেওয়া এবং একইসঙ্গে যাঁরা যোগ্য নন, তাঁদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে রাজ্যজুড়ে চলা বিক্ষোভ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয় এবং সরকারের ঘোষিত ৪৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।
