যাদবপুরে মধ্যরাতে SFI-ABVP সংঘর্ষ, ভাঙচুর-আগুন ঘিরে উত্তেজনা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও GBM ঘিরে মধ্যরাতে SFI-ABVP সংঘর্ষ। ভাঙচুর, পোস্টার পোড়ানো ও পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগে উত্তেজনা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে রণক্ষেত্র! ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে SFI-ABVP সংঘর্ষ
সিটি নিউজ বাংলা, কলকাতা, স্টেট ডেস্ক : ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির সাধারণ সভা বা GBM-কে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে SFI ও ABVP সমর্থকদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ, ভাঙচুর, পোস্টার ও ফেস্টুনে আগুন এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাতভর কার্যত থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ঘটনার জেরে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছে।
GBM ঘিরেই প্রথমে শুরু হয় বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির সাধারণ সভা বা GBM ডাকা নিয়ে বলে জানা গিয়েছে। অরবিন্দ ভবনে এই সভা আয়োজনকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে না হওয়ায় ক্যাম্পাসে এমনিতেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। সেই আবহে সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
মধ্যরাতে বহিরাগত ঢোকার অভিযোগ
বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ, মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে বাইরে থেকে একদল লোক ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় থাকা বামপন্থীদের ফেস্টুন ও পতাকা নষ্ট করা হয় এবং কয়েকটি পোস্টারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ABVP-র পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে কে বা কারা প্রথম হামলা চালিয়েছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
৮বি বাসস্ট্যান্ড ও ৪ নম্বর গেটে উত্তেজনা
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮বি বাসস্ট্যান্ড এবং ৪ নম্বর গেটের সামনে। দুই পক্ষের মিছিল ও জমায়েতকে ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড তৈরি করলে তা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ। এরপর পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
ক্যাম্পাসের আশপাশে রাতের অন্ধকারে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অনেক পড়ুয়া। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের মোতায়েন করা হয়।
ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় চাঞ্চল্য
সংঘর্ষের মধ্যে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর এবং পোস্টার-ফেস্টুন পোড়ানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মতাদর্শগত বিভাজন এই ঘটনার মাধ্যমে ফের প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের একাংশের প্রশ্ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জায়গায় রাতের বেলা কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল এবং কীভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢোকার সুযোগ পেল?
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফের প্রশ্ন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়া নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নির্বাচন না থাকায় ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনের সঙ্গে পড়ুয়াদের যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে ঘিরে দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। ছাত্র সংগঠনগুলির একাংশ দ্রুত নির্বাচন করার দাবি জানাচ্ছে।
তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যাতে নতুন করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করাও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তদন্ত কমিটি গড়ার সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের
ঘটনার পর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঠিক কী ঘটেছিল, কারা সংঘর্ষে জড়িত ছিল, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে কীভাবে ঢুকল এবং ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কারা যুক্ত—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ক্যাম্পাসে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ গেট এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ক্যাম্পাসে নতুন করে যাতে কোনও সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা না ছড়ায়, সেদিকেও নজর রাখছে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগে আরও উত্তপ্ত পরিস্থিতি
ঘটনার পর SFI এবং ABVP—দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। এক পক্ষের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে হামলা চালানো হয়েছে। অন্য পক্ষের অভিযোগ, তাদের কর্মী-সমর্থকদের উপরও হামলা ও বাধা দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসার পরই সংঘর্ষের জন্য কারা দায়ী, তা স্পষ্ট হবে।
নজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
রাতের এই সংঘর্ষের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি ফের রাজ্য রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন, বহিরাগত প্রবেশ, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘাত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট স্পর্শকাতর।
এখন তদন্তের রিপোর্টে কী উঠে আসে এবং দীর্ঘদিনের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে পড়ুয়া থেকে শুরু করে শিক্ষামহল ও রাজনৈতিক মহল।
