পুনেতে রাহুলের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ ঘিরে সংঘাত, টাকা দিয়ে ভিড়ের অভিযোগ বিজেপির
পুনেতে রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি ঘিরে বিজেপি-কংগ্রেস সংঘাত। টাকা দিয়ে ভিড়ের অভিযোগ, NSUI-ABVP সংঘর্ষ, FIR ও ৩০ শর্তে উত্তেজনা।
SEO Title
পুনেতে রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক তরজা
সিটি নিউজ বাংলা, পুনে, ন্যাশনাল ডেস্ক : লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি ঘিরে মহারাষ্ট্রের পুনেতে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার উদ্দেশ্যে ২২ আগস্ট এই কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।

একদিকে বিজেপির অভিযোগ, তরুণদের কর্মসূচিতে নিয়ে আসতে টাকা খরচ করে ভিড় জমানো হয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের দাবি, রাহুল গান্ধীর অনুষ্ঠানে তরুণদের বিপুল সাড়া দেখে আতঙ্কিত হয়ে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে কুৎসা ছড়াচ্ছে।
‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ নয়, ‘পয়সে কি গুঞ্জ’—বিজেপির কটাক্ষ
রাহুল গান্ধীর কর্মসূচিকে নিশানা করে বিজেপি মুখপাত্র নবনাথ বান এবং প্রদীপ ভান্ডারী গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, অনুষ্ঠানটির নাম ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ হলেও বাস্তবে এটি ‘পয়সে কি গুঞ্জ’-এ পরিণত হয়েছে।
বিজেপির অভিযোগ, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য এবং সামাজিক মাধ্যমে কর্মসূচির প্রচার করার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সারকে মাথাপিছু ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
এমনকী গোটা কর্মসূচিতে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলেও বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে এবং কংগ্রেস এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
কর্মসূচির আগের রাতেই কলেজ ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ
রাহুল গান্ধীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা অবশ্য শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান হওয়ার আগের রাতেই। ২১ আগস্ট পুনের কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (COEP)-এর হস্টেল চত্বরে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন NSUI এবং বিজেপির ছাত্র সংগঠন ABVP-র মধ্যে সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে।
ABVP-র অভিযোগ, কংগ্রেসের কর্মীরা ছাত্রীদের উপর চাপ সৃষ্টি করে রাহুল গান্ধীর অনুষ্ঠানে নাম নথিভুক্ত করার জন্য বাধ্য করছিলেন। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা এবং পরে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে দাবি।
ঘটনার পর পুলিশি হস্তক্ষেপ করতে হয়। এই ঘটনায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর বিরুদ্ধে FIR দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে। তাদের দাবি, অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
৩০টি শর্তে কর্মসূচির অনুমতি
রাহুল গান্ধীর কর্মসূচি ঘিরে পুনে পুলিশও একাধিক বিধিনিষেধ জারি করেছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের জন্য ৩০টি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
এই শর্তগুলির মধ্যে আপত্তিকর ব্যানার, পোস্টার বা ছবি ব্যবহার না করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে এমন কোনও বক্তব্য বা প্রদর্শন না করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার মতো একাধিক নির্দেশ ছিল।
কংগ্রেসের অভিযোগ, এত বিপুল সংখ্যক শর্ত চাপিয়ে এবং শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করে কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
মেট্রো বন্ধ নিয়েও কংগ্রেসের ক্ষোভ
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কর্মসূচির সময় মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং বিভিন্ন এলাকায় কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি করা হয়েছিল।
দলের নেতাদের দাবি, রাহুল গান্ধীর কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণ যাতে কমে যায়, সেই উদ্দেশ্যেই প্রশাসনিক স্তরে নানা বাধা তৈরি করা হয়েছিল।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণ কংগ্রেসের
বিজেপির টাকা দিয়ে ভিড় জমানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। দলের নেতা সচিন সাওয়ান্ত দাবি করেছেন, রাহুল গান্ধীর কর্মসূচিতে তরুণ প্রজন্মের বিপুল সাড়া দেখে বিজেপি ভয় পেয়ে গিয়েছে।
তাঁর দাবি, কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে নতুন প্রজন্ম শিক্ষা, চাকরি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী।
সচিন সাওয়ান্ত আরও কটাক্ষ করে দাবি করেন, এই বিপুল জনসমাগম দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘ঘুম উড়ে গিয়েছে’।
তরুণ ভোটারদের নিয়ে রাহুলের বার্তা
‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধী তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সমতার মতো বিষয় নিয়েও তিনি বক্তব্য রাখেন।
রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করে অভিযোগ করেন, দেশের তরুণদের সামনে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। পাশাপাশি মহিলাদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়েও তিনি বিজেপি ও আরএসএসের মতাদর্শের সমালোচনা করেন।
মহিলাদের অধিকার নিয়েও সরব রাহুল
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিভিন্ন আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, বিজেপি ও আরএসএস মহিলাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে চায় এবং তাঁদের ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখার মানসিকতা পোষণ করে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধেও তিনি লিঙ্গবৈষম্যমূলক মনোভাবের অভিযোগ তোলেন।
তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ফের শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিজেপির পক্ষ থেকে এই ধরনের বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
Gen-Z ভোটারদের ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক লড়াই
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে Gen-Z বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নিজেদের রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে যুক্ত করতে বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলই সক্রিয়।
এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধীর ছাত্র সংযোগ কর্মসূচিকে কংগ্রেসের তরুণদের কাছে পৌঁছনোর বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপিও কংগ্রেসের এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে।
ফলে ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ এখন শুধুমাত্র একটি ছাত্র-যুব কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই। টাকা দিয়ে ভিড় জমানোর অভিযোগ, কলেজ ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, FIR, পুলিশের ৩০টি শর্ত এবং দুই দলের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ—সব মিলিয়ে পুনের এই কর্মসূচি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে।
আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও কতটা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে বিজেপি ও কংগ্রেস কী কৌশল নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
