গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন কমিটি, অমিত শাহের বড় রাজনৈতিক বার্তা
অমিত শাহের উপস্থিতিতে সুকনায় ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে গোর্খা সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে নতুন মধ্যস্থতাকারী কমিটি। নেতৃত্বে পঙ্কজ কুমার সিং।
গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন কমিটি, অমিত শাহের বড় রাজনৈতিক বার্তা
সিটি নিউজ বাংলা, শিলিগুড়ি, ন্যাশনাল ডেস্ক, ২৩ আগস্ট ২০২৬: উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ দিনে শিলিগুড়ির সুকনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ত্রিপাক্ষিক বৈঠককে ঘিরে পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলেছে। দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের দীর্ঘদিনের গোর্খা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একটি নতুন উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতাকারী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। কেন্দ্রের লক্ষ্য, আলোচনার মাধ্যমে এই অঞ্চলের জন্য একটি ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ বা Permanent Political Solution (PPS)-এর সূত্র খুঁজে বের করা।

তিন দিনের উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ দিনে অমিত শাহের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল।
গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নতুন উদ্যোগ
দার্জিলিং পাহাড়ে পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অধিকার, পরিচয় এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির মতো একাধিক দাবিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হয়ে আসছে। একাধিকবার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের তরফে নতুন করে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই আলোচনার মাধ্যমে পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানের খসড়া তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কমিটির নেতৃত্বে পঙ্কজ কুমার সিং
নতুন মধ্যস্থতাকারী কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন দেশের প্রাক্তন ডেপুটি NSA এবং প্রাক্তন BSF ডিজি পঙ্কজ কুমার সিং। তাঁকে এই অঞ্চলের জন্য কেন্দ্রের বিশেষ Interlocutor বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা। তাঁদের দাবি, মতামত ও সমস্যাগুলি পর্যালোচনা করে একটি সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া তৈরি করা হবে।
সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সমাধানের বার্তা
বৈঠকে অমিত শাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে যে, গোর্খা সম্প্রদায়ের পরিচয়, অধিকার এবং অন্যান্য দাবির সমাধান খোঁজা হলেও তা অবশ্যই ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে।
অর্থাৎ, পাহাড়ের রাজনৈতিক দাবিগুলির ক্ষেত্রে কেন্দ্র আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে আগ্রহী হলেও সেই সমাধান দেশের সাংবিধানিক সীমারেখার বাইরে যাবে না।
এই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ পাহাড়ের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন।
বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা
সুকনার বৈঠকে কেন্দ্র ও রাজ্যের পাশাপাশি পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা বা GJM প্রধান বিমল গুরুং এবং গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট বা GNLF প্রধান মন ঘিসিং।
ফলে দীর্ঘদিন পর পাহাড়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষকে একই আলোচনার টেবিলে এনে স্থায়ী সমাধানের রাস্তা খোঁজার উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা
কেন্দ্রের এই উদ্যোগের ফলে পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দল ও সংগঠন নিজেদের মতো করে পাহাড়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দাবি জানিয়ে এসেছে।
এবার কেন্দ্রের মধ্যস্থতায় একটি নির্দিষ্ট আলোচনার কাঠামো তৈরি হলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি এক জায়গায় এনে সমাধানের সূত্র বের করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আলোচনার মাধ্যমে কত দ্রুত এবং কী ধরনের সমাধান বেরিয়ে আসে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তাতেও বিশেষ নজর
অমিত শাহের উত্তরবঙ্গ সফরের গুরুত্ব শুধুমাত্র গোর্খা সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত, তার নিরাপত্তা নিয়েও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা, নজরদারি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি অমিত শাহের সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
SSB ও নিরাপত্তা আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক
শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিয়ে অমিত শাহ সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
উত্তরবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমান্ত, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বিশেষ করে ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোরকে নিরাপদ রাখা যে কেন্দ্রের অন্যতম অগ্রাধিকার, এই সফরে তারই ইঙ্গিত মিলেছে।
এখন নজর মধ্যস্থতাকারী কমিটির পরবর্তী পদক্ষেপে
অমিত শাহের সফরের পর এখন নজর নতুন মধ্যস্থতাকারী কমিটির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। পঙ্কজ কুমার সিং-এর নেতৃত্বে কমিটি কবে থেকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে এবং কীভাবে পাহাড়ের বিভিন্ন দাবিকে একত্রিত করে সমাধানের সূত্র তৈরি করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিনের গোর্খা সমস্যা যদি আলোচনার মাধ্যমে কোনও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোয়, তাহলে তা শুধু দার্জিলিং নয়, তরাই ও ডুয়ার্সের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অমিত শাহের উত্তরবঙ্গ সফর তাই একদিকে পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের নতুন উদ্যোগ, অন্যদিকে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তাকে কেন্দ্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরল। এখন দেখার, নতুন মধ্যস্থতাকারী কমিটির হাত ধরে বহু বছরের রাজনৈতিক জট শেষ পর্যন্ত কতটা খুলতে পারে।
