৩০ বছরের মাওবাদী আতঙ্কের অবসান, সম্পূর্ণ মাওবাদী-মুক্ত সারান্দা জঙ্গল
সারান্দা জঙ্গল ৩০ বছর পর মাওবাদী-মুক্ত। শেষ চার মাওবাদীর আত্মসমর্পণ, অভিযানে সাফল্য ও স্বাধীনতা দিবসে তেরঙ্গা উত্তোলনে নতুন অধ্যায়।
৩০ বছরের মাওবাদী আতঙ্কের অবসান, সম্পূর্ণ মাওবাদী-মুক্ত সারান্দা জঙ্গল

সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক ৪ , ঝাড়খণ্ড: দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে মাওবাদী কার্যকলাপের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার সারান্দা জঙ্গলে এল বড়সড় সাফল্য। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তার এবং মাওবাদীদের আত্মসমর্পণের পর অবশেষে সারান্দা জঙ্গলকে সম্পূর্ণ মাওবাদী-মুক্ত বা নকশালমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক মহলের কাছে এই ঘটনাকে ঝাড়খণ্ডের মাওবাদী দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে সারান্দা ও সংলগ্ন কোলহান বনাঞ্চলের দুর্গম এলাকা মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ঘন জঙ্গল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে সক্রিয় ছিল মাওবাদী সংগঠন। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষও হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে লাগাতার অভিযান এবং প্রশাসনের উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে ওই এলাকায় মাওবাদীদের প্রভাব কমতে শুরু করে।
শেষ চার মাওবাদীর আত্মসমর্পণ
সারান্দাকে মাওবাদী-মুক্ত ঘোষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে শেষ চার সক্রিয় মাওবাদী সদস্যের আত্মসমর্পণ। পুলিশের কাছে তাঁদের আত্মসমর্পণের পরই এই জঙ্গলকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাওবাদী-মুক্ত ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি আত্মসমর্পণ নীতিও মাওবাদীদের মূল সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযানে বড় সাফল্য নিরাপত্তা বাহিনীর
২০২৬ সালের শুরু থেকে সারান্দা ও সংলগ্ন এলাকায় মাওবাদী বিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হয়। বিভিন্ন অভিযানে সংঘর্ষের ঘটনায় মোট ২২ জন মাওবাদী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি শীর্ষ মাওবাদী নেতা মিসির বেসরা-সহ ১১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের আত্মসমর্পণ নীতিতে সাড়া দিয়ে ৫০ জনেরও বেশি মাওবাদী অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। ফলে সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি এবং প্রত্যন্ত এলাকায় তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
স্বাধীনতা দিবসে ইতিহাসের সাক্ষী প্রত্যন্ত গ্রাম
সারান্দা ও কোলহান বনাঞ্চল মাওবাদী-মুক্ত ঘোষণার পর এবারের স্বাধীনতা দিবসে তৈরি হয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রত্যন্ত সাঙ্গাজাতা গ্রামে ১৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
দীর্ঘদিন মাওবাদী প্রভাবের কারণে যে এলাকায় সরকারি উপস্থিতি এবং জাতীয় প্রতীক ঘিরে নানা ধরনের বাধা ছিল, সেখানে স্বাধীনতা দিবসে তেরঙ্গা উত্তোলনকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও এই ঘটনা নতুন আশার বার্তা বহন করছে।
এবার লক্ষ্য উন্নয়ন ও সাধারণ জীবন ফিরিয়ে আনা
মাওবাদী প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর সারান্দার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিকে উন্নয়নের মূল স্রোতে নিয়ে আসাই এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকায় স্বাস্থ্য শিবির, চিকিৎসা পরিষেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা গ্রামগুলিতে সরকারি পরিষেবা আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তা, পানীয় জল এবং অন্যান্য মৌলিক পরিষেবার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা থেকে উন্নয়নের পথে সারান্দা
একসময় যে সারান্দা জঙ্গল মাওবাদী কার্যকলাপের জন্য দেশের অন্যতম পরিচিত এলাকা ছিল, এখন সেই অঞ্চলকে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান যেমন মাওবাদী সংগঠনের সশস্ত্র শক্তিকে দুর্বল করেছে, তেমনই আত্মসমর্পণকারীদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরানোর উদ্যোগও পরিস্থিতি বদলাতে সাহায্য করেছে।
তবে মাওবাদী-মুক্ত ঘোষণার পরেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি শিথিল না করে নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উন্নয়নের কাজকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। সারান্দার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে সরকারি পরিষেবা ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছলে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ৩০ বছরের মাওবাদী অধ্যায়ের অবসানের পর সারান্দার এই পরিবর্তন তাই শুধু নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সাফল্য নয়, বরং শান্তি, উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার নতুন সম্ভাবনার সূচনা বলেই মনে করা হচ্ছে।
