মালদহ মেডিক্যালে অগস্টে ৮৯ শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে ৪ সদস্যের তদন্ত
মালদহ মেডিক্যাল কলেজে অগস্টে ৮৯ শিশুর মৃত্যু। স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে ৪ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল তদন্ত শুরু করেছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে রেফার্ড কেস, চিকিৎসা পরিষেবা ও পরিকাঠামো।
মালদহ মেডিক্যালে অগস্টে ৮৯ শিশুমৃত্যু, স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে তদন্ত শুরু

মালদহ, স্টেট ডেস্ক ৬: অগস্ট মাসে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পরপর শিশুমৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। চলতি মাসে এখনও পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৮৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশে চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এসে তদন্ত শুরু করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, অগস্ট মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই প্রায় ৬০ জন শিশুর মৃত্যু হয়। এরপর ২৯ আগস্ট পর্যন্ত মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯-এ। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে অগস্টের মাঝামাঝি সময়ে, যখন একদিনেই ১০ জন নবজাতকের মৃত্যুর খবর সামনে আসে।
ঘটনার পরেই হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা, শিশুদের শারীরিক অবস্থা, রেফার করার প্রক্রিয়া এবং হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে স্বাস্থ্য ভবনের তরফে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে।
‘রেফার্ড কেস’ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মৃত শিশুদের একটি বড় অংশকে অন্যান্য হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় মালদহ মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয়েছিল। অনেক শিশুই হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই গুরুতর অসুস্থ ছিল বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
বিশেষ করে কম ওজনের নবজাতক, জন্মের পর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশু এবং অন্যান্য জটিলতায় ভোগা শিশুদের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে।
তবে এক মাসে এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু কেন হল, তার পিছনে চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও ঘাটতি বা অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, সেটিই এখন বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘এক মাসে ৮৯ শিশুর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়’, জানাল বিশেষজ্ঞ দল
বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান চিকিৎসক প্রলয় আচার্য জানিয়েছেন, এক মাসে ৮৯টি শিশুর মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাই প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখা প্রয়োজন। হাসপাতালের নথিপত্র, মৃত শিশুদের চিকিৎসার ইতিহাস এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি চিকিৎসা পরিষেবার বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে বেশ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে অপুষ্টি, অত্যন্ত কম ওজন, জন্মের পর শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যা-সহ একাধিক জটিলতার কথা সামনে এসেছে।
পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শুধু শিশুদের শারীরিক অসুস্থতাই নয়, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত কিছু সমস্যা এবং জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতির বিষয়ও নজরে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।
কোন পরিস্থিতিতে শিশুদের মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হচ্ছে, রেফারের সময় তাঁদের শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো যথেষ্ট ছিল কি না—এই সমস্ত বিষয়ই তদন্তের আওতায় রাখা হচ্ছে।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজতে বিস্তারিত তদন্ত
বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তে প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর পৃথক কারণ বিশ্লেষণ করা হতে পারে। একইসঙ্গে শিশু বিভাগ ও নবজাতক ইউনিটের চিকিৎসা পরিকাঠামো, বেডের সংখ্যা, চিকিৎসক ও নার্সিং কর্মীর উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা এবং জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একসঙ্গে এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞ দলের তদন্ত রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য দফতর থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষ।
শিশুমৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, রেফার্ড শিশুদের কতটা সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং চিকিৎসা পরিষেবা বা পরিকাঠামোগত কোনও ঘাটতি এই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত কি না—তদন্ত শেষ হলেই সেই ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে।
