হরমুজে যুদ্ধের আঁচ, ধস ভারতীয় শেয়ার বাজারে! সেনসেক্স-নিফটিতে বড় পতন
হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কায় বাড়ল অপরিশোধিত তেলের দাম। এর জেরে বুধবার বড় পতন সেনসেক্স-নিফটিতে। চাপ রুপি ও বিভিন্ন খাতেও।
হরমুজে যুদ্ধের আঁচ, ধস ভারতীয় শেয়ার বাজারে—সেন্সেক্স-নিফটিতে বড় পতন

সিটি নিউজ বাংলা, ২ সেপ্টেম্বর, ন্যাশনাল ডেস্ক ১৪ : ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়ল আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে। আর তেলের দাম বাড়তেই বুধবার সকালে বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় পুঁজিবাজার।
আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল-পিছু ৯৫ ডলারের উপরে উঠে যায়। একই সময়ে মার্কিন WTI ক্রুডও ৯১ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মঙ্গলবার তেলের দামে বড়সড় বৃদ্ধির পর বুধবারও সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারে। বুধবার দিনের শুরুতেই BSE Sensex প্রায় ৪৭৩ পয়েন্ট পড়ে ৭৬,৪৭১-এর কাছাকাছি এবং NSE Nifty ৫০ প্রায় ১৯৮ পয়েন্ট নেমে ২৩,৮৫৮-এর কাছে চলে যায়। পরবর্তী লেনদেনে বিক্রির চাপ আরও বাড়ে; এক পর্যায়ে সেনসেক্সের পতন ৭০০ পয়েন্টেরও বেশি হয় এবং নিফটি ২৩,৮০০-এর নিচের দিকেও চলে যায়।
হরমুজের যুদ্ধের আঁচ – ধস ভারতীয় শেয়ার বাজারে
কেন এতটা উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ শুধু যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাতের আশঙ্কা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
ভারতের জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি কেন বড় চিন্তার?
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যত বাড়বে, দেশের তেল আমদানির খরচও তত বাড়বে। এর ফলে একদিকে বাড়তে পারে আমদানি বিল, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতির উপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উঁচু থাকলে পরিবহণ, শিল্প উৎপাদন, লজিস্টিকস থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাজারেও পড়তে পারে।
রুপির উপরও চাপ
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তেল আমদানির জন্য ভারতীয় সংস্থাগুলিকে আরও বেশি ডলার খরচ করতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে এবং ভারতীয় টাকার উপর চাপ তৈরি হয়। বুধবার সকালে মার্কিন ডলারের তুলনায় রুপি প্রায় ৯৪.৯৭-এর কাছাকাছি ছিল।
রুপির দুর্বলতা এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে চলতে থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয়ের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলেই বাজার মহলের আশঙ্কা।
কোন কোন খাতে বেশি চাপ?
তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে সেই সমস্ত সংস্থা, যাদের উৎপাদন বা ব্যবসার খরচের সঙ্গে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে—
বিমান পরিবহণ সংস্থা
টায়ার প্রস্তুতকারক সংস্থা
পেইন্ট কোম্পানি
লজিস্টিকস ও পরিবহণ সংস্থা
তেল বিপণন সংস্থা
বিভিন্ন শিল্প সংস্থা
এই খাতগুলির পরিচালন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বুধবার BPCL, HPCL, Indian Oil-এর মতো তেল বিপণন সংস্থার শেয়ারেও চাপ দেখা যায়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও পরিবর্তন
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে তৈরি হয়েছে Risk-Off Mood। অর্থাৎ অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
আমেরিকার বাজারেও মঙ্গলবার বড় পতন হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কার কারণে মার্কিন বন্ডের ফলনও বেড়েছে। এশিয়ার একাধিক বাজারেও বুধবার দুর্বলতা দেখা যায়।
ফেডের সুদনীতি নিয়েও নতুন আশঙ্কা
তেলের দাম দ্রুত বাড়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ফের মাথাচাড়া দিয়েছে। এর ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদনীতি নিয়েও বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতিতে সুদ কমানোর বদলে সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন বন্ডের ফলন বৃদ্ধি এবং ডলারের শক্তিশালী হওয়াও উদীয়মান বাজারগুলির জন্য চাপ বাড়াতে পারে।
ভারতীয় শেয়ার বাজারে কি আরও অস্থিরতা আসতে পারে?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে পরিস্থিতির বড় নিয়ামক হবে আমেরিকা-ইরান সংঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ কতটা স্বাভাবিক থাকে।
যদি দ্রুত উত্তেজনা কমে এবং তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তাহলে বাজারে ফের স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়লে ভারতীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি, রুপি, কর্পোরেট মুনাফা এবং সুদের হার—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী থাকলেও বিশ্ব ভূ-রাজনীতি ও অপরিশোধিত তেলের দামের গতিপথই এখন শেয়ার বাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুধবারের ব্যাপক পতন সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন বলে মনে করছে বাজার মহল।
