দার্জিলিংয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা! ভেঙে পড়ল ঐতিহাসিক টয়ট্রেনের লোকো শেডের ছাদ
দার্জিলিংয়ে প্রবল বৃষ্টির জেরে ভেঙে পড়ল ঐতিহাসিক টয়ট্রেনের লোকোমোটিভ শেডের ছাদ। আহত ৭ রেলকর্মী ও মেকানিক। বুধবার ও বৃহস্পতিবার বন্ধ জয়রাইড।
ভয়াবহ দুর্ঘটনা! হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ঐতিহাসিক টয়ট্রেনের লোকো শেডের ছাদ

দার্জিলিং, ২ সেপ্টেম্বর, স্টেট ডেস্ক ১৬ : একটানা মুষলধারে বৃষ্টির জেরে পাহাড়ে ফের বড়সড় বিপত্তি। বুধবার সকালে দার্জিলিংয়ের ঐতিহাসিক দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (DHR)-র লোকোমোটিভ শেডের ছাদ আচমকাই ভেঙে পড়ে। পুরনো কাঠ ও লোহার বিম দিয়ে তৈরি শেডের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। দুর্ঘটনায় এক চুক্তিভিত্তিক কর্মী-সহ মোট সাত জন রেলকর্মী ও মেকানিক আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
দার্জিলিংয়ের এই ঐতিহাসিক টয়ট্রেন পরিষেবা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ফলে এই দুর্ঘটনার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পর্যটক মহল থেকে শুরু করে রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যেও।
বৃষ্টির মধ্যেই আচমকা ভেঙে পড়ল ছাদ
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরেই দার্জিলিং পাহাড়ে লাগাতার বৃষ্টি চলছে। একটানা বৃষ্টির জেরে পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ও পরিকাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যেই বুধবার সকালে লোকোমোটিভ শেডে নিয়মমাফিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল।
শেডের ভিতরে তখন ঐতিহ্যবাহী চারটি স্টিম ইঞ্জিন রাখা ছিল। সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন রেলকর্মী ও মেকানিকরা। আচমকাই বিকট শব্দে শেডের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে কাঠ, লোহার বিম এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী কর্মীদের উপর এসে পড়ে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন কর্মীরা
ছাদ ভেঙে পড়ার পর শেডের ভিতরে থাকা কয়েকজন কর্মী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অন্যান্য রেলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একে একে আহতদের বের করে আনা হয়। দুর্ঘটনায় মোট সাত জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মীও রয়েছেন। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
দুর্ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। কীভাবে এত পুরনো কাঠ ও লোহার কাঠামোর শেডে এখনও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল এবং ছাদটির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
চারটি স্টিম ইঞ্জিনই ছিল শেডের ভিতরে
দুর্ঘটনার সময় শেডের ভিতরে চারটি ঐতিহ্যবাহী স্টিম ইঞ্জিন থাকায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ইঞ্জিনগুলিই দার্জিলিংয়ের ঐতিহাসিক টয়ট্রেন পরিষেবার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
ছাদ ধসে পড়ার ফলে ইঞ্জিনগুলির কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণে শেডের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।
বুধ ও বৃহস্পতিবার বন্ধ টয়ট্রেনের জয়রাইড
দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার চারটি টয়ট্রেনের জয়রাইড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। শেড ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পরই পরিষেবা ফের চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের জন্যও সাময়িকভাবে টয়ট্রেনের জয়রাইড বন্ধ থাকছে। বিশেষ করে পর্যটন মরশুমে এই পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় পর্যটকদের একাংশের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে রেল
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, তা খতিয়ে দেখছে রেল কর্তৃপক্ষ। প্রবল বৃষ্টির জেরে শেডের কাঠামো দুর্বল হয়ে ছাদ ভেঙে পড়েছে, নাকি দীর্ঘদিনের পুরনো পরিকাঠামোর কারণে এই বিপত্তি—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
একইসঙ্গে শেডের বাকি অংশ কতটা নিরাপদ, সেখানে কর্মীদের কাজ চালানো সম্ভব কি না এবং ঐতিহ্যবাহী স্টিম ইঞ্জিনগুলিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী টয়ট্রেন পরিষেবা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু একটি রেল পরিষেবা নয়, পাহাড়ের ইতিহাস ও পর্যটনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি ঐতিহ্য। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া এই রেলপথে টয়ট্রেনের যাত্রা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
তাই ঐতিহাসিক লোকো শেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় দুর্ঘটনার ঘটনায় নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, পাহাড়ে লাগাতার বর্ষণের সময় পুরনো রেল পরিকাঠামোগুলির নিয়মিত কাঠামোগত পরীক্ষা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে আহত সাত কর্মীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন সহকর্মী ও স্থানীয়রা। পাশাপাশি পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
দার্জিলিংয়ে বৃষ্টির দাপট অব্যাহত থাকায় আগামী দিনে পাহাড়ের আরও পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিকাঠামো নিয়ে প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর সকলের।
