রুশ তেল আমদানিতে ২৬% পতন, ভেনেজুয়েলার তেলে ভারতের নজর
অগাস্টে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ২৬% কমে দৈনিক ২.০৮ মিলিয়ন ব্যারেলে। বাড়ল ভেনেজুয়েলা, UAE-সহ বিকল্প উৎসের নির্ভরতা।
রুশ তেল আমদানিতে বড় ধাক্কা! অগাস্টে ভারতের আমদানি কমল ২৬%

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১১ : রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বড়সড় পতন ভারতের। চলতি বছরের অগাস্টে রুশ অপরিশোধিত তেলের আমদানি জুলাইয়ের রেকর্ড মাত্রার তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কমে দৈনিক ২.০৮ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। জুলাইয়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৮২ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। ফলে এক মাসের ব্যবধানে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমেছে প্রায় ৭৪০ হাজার ব্যারেল প্রতিদিন।
তবে আমদানি কমলেও ভারতের তেল বাজারে রাশিয়ার গুরুত্ব এখনও অটুট। অগাস্টেও রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। জুলাইয়ে এই অংশ ছিল প্রায় ৫৫.৯ শতাংশ।
চিনের বাড়তি চাহিদায় ভারতকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে
রুশ তেল আমদানিতে এই পতনের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চিনের বাড়তি চাহিদা। রাশিয়ার তুলনামূলক সস্তা বা ছাড়যুক্ত অপরিশোধিত তেলের জন্য চিনা শোধনাগারগুলির আগ্রহ বেড়েছে। ফলে এশিয়ার বাজারে রুশ তেলের একই কার্গোর জন্য ভারতীয় শোধনাগারগুলিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় শোধনাগারগুলি রুশ তেলের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে—এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বরং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য ক্রেতার বাড়তি চাহিদার কারণে অগাস্টে আমদানি কমেছে। Kpler-এর হিসাব অনুযায়ী, আগামী দিনগুলিতে ভারতে রুশ তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ২ থেকে ২.৫ মিলিয়ন ব্যারেলের মধ্যে স্থিতিশীল হতে পারে।
রাশিয়াতেও জ্বালানি পরিকাঠামোয় চাপ
রুশ তেলের সরবরাহ কমার পেছনে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ও জ্বালানি পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার নিজস্ব জ্বালানি বাজারে চাপ বেড়েছে এবং দেশীয় চাহিদা পূরণে শোধনাগারগুলির কার্যক্রম বজায় রাখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
অগাস্টের শেষদিকে রাশিয়ায় পেট্রল উৎপাদন দেশীয় চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ড্রোন হামলার কারণে বেশ কয়েকটি বড় শোধনাগারে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়াকে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাড়তি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
ভারতের একাধিক শোধনাগারে রক্ষণাবেক্ষণের প্রভাব
রুশ তেল আমদানির পতনের আরেকটি কারণ ভারতের নিজস্ব শোধনাগারগুলির রক্ষণাবেক্ষণ। অগাস্টে ভারতের কয়েকটি বড় রিফাইনারিতে পূর্বপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির কাজ চলেছে। ফলে সাময়িকভাবে অপরিশোধিত তেল গ্রহণের পরিমাণ কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রুশ তেলের আমদানি কমার ক্ষেত্রে রিফাইনারি মেইনটেন্যান্স, রুশ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং চিনা ক্রেতাদের প্রতিযোগিতা—তিনটি কারণই একসঙ্গে কাজ করেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের চাপও বড় কারণ
রুশ তেল নিয়ে ভারতের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক শুল্ককে ঘিরে। রুশ তেল আমদানিকারক দেশগুলির বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনা হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় ক্রেতাদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা বেড়েছে।
তবে অগাস্টের পতনকে সরাসরি রুশ তেল থেকে ভারতের সরে আসা হিসেবে দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকরা। কারণ রাশিয়া এখনও ভারতের মোট তেল আমদানির সবচেয়ে বড় অংশ সরবরাহ করছে।
ভেনেজুয়েলার তেলে ভারতের বাড়তি ভরসা
রুশ তেলের সরবরাহ কমার পাশাপাশি ভারত বিকল্প উৎসের দিকে দ্রুত নজর দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ভেনেজুয়েলা। অগাস্টে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে দৈনিক প্রায় ৩.৫৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। ২০২০ সালের পর এটি সর্বোচ্চ স্তর।
এর ফলে অগাস্টে ভেনেজুয়েলা ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে এবং সৌদি আরবকে টপকে গিয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর ভারতীয় শোধনাগারগুলি ভেনেজুয়েলার তেলের দিকে ফের বেশি ঝুঁকেছে বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
UAE, সৌদি আরব, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও নজর
ভারত শুধু ভেনেজুয়েলার ওপর নির্ভর করছে না। রুশ ও পশ্চিম এশীয় সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল ও অন্যান্য উৎস থেকেও অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে UAE ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা তৃতীয় স্থানে চলে এসেছে।
এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়ায় ভারতীয় শোধনাগারগুলি সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। অগাস্টে পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিও জুলাইয়ের তুলনায় বেড়েছে বলে Kpler-এর তথ্য উল্লেখ করে Business Standard জানিয়েছে।
মোট তেল আমদানিতেও পতন
রুশ তেল আমদানির পতনের প্রভাব ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতেও পড়েছে। Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানি ছিল দৈনিক প্রায় ৪.৬২ মিলিয়ন ব্যারেল, যা জুলাইয়ের ৫.০৪ মিলিয়ন ব্যারেলের তুলনায় প্রায় ৮.৪ শতাংশ কম।
অর্থাৎ, শুধু সরবরাহকারী দেশ পরিবর্তন নয়—ভারতের সামগ্রিক তেল আমদানির পরিমাণও অগাস্টে কমেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ, পরিবহণ ব্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছুই ভারতের জন্য তেল সংগ্রহের কৌশলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে পারে আমদানি ব্যয়ের চাপ
রুশ তেলের অন্যতম বড় সুবিধা ছিল তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে সরবরাহ পাওয়া। ফলে রুশ তেলের জায়গায় যদি ভারতকে আরও বেশি দূরের উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল কিনতে হয়, তাহলে পরিবহণ ও বিমা খরচ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি বিলের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব সরাসরি পেট্রল-ডিজেলের দামে পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম, রুপির বিনিময় হার, পরিবহণ ব্যয় এবং সরকারি মূল্যনীতি-সহ একাধিক বিষয়ের ওপর।
রুশ তেল থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না ভারত
তবে বর্তমান পরিসংখ্যান একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—ভারত রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও এখনও রাশিয়াই দেশের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী। অগাস্টে আমদানি কমলেও রুশ তেলের অংশ এখনও ৪০ শতাংশের বেশি।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে রুশ তেল থেকে ভারতের সম্পূর্ণ সরে আসা না বলে বরং সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার কৌশল হিসেবে দেখছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। সামনে রাশিয়ার রপ্তানি সক্ষমতা, চিনের চাহিদা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি—এই চারটি বিষয় ভারতের তেল আমদানির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
সব মিলিয়ে, অগাস্টে রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ২৬ শতাংশ পতন ভারতের জ্বালানি বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে রাশিয়া এখনও ভারতের তেল সরবরাহের মেরুদণ্ড। একইসঙ্গে ভেনেজুয়েলা, UAE, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ভারতের বাড়তি ঝোঁক থেকে স্পষ্ট—জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে নয়াদিল্লি এখন একাধিক উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পথেই এগোচ্ছে।
