জম্মু-কাশ্মীরে স্টাইপেন্ড বাড়ানোর দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি
স্টাইপেন্ড ১২,৩০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা করার দাবিতে জম্মু-কাশ্মীরের সরকারি হাসপাতালগুলিতে MBBS ও BDS ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি।
স্টাইপেন্ড বাড়ানোর দাবিতে জম্মু-কাশ্মীরে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি

শ্রীনগর, ন্যাশনাল ডেস্ক ৯ : মাসিক স্টাইপেন্ড বৃদ্ধির দাবিতে জম্মু-কাশ্মীরের সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ এবং হাসপাতালগুলিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন MBBS ও BDS ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। বর্তমানে মাসে মাত্র ১২,৩০০ টাকা স্টাইপেন্ড পাওয়া ইন্টার্নরা তা বাড়িয়ে ৩০,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
জম্মু-কাশ্মীরের একাধিক সরকারি মেডিকেল প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে GMC শ্রীনগর, GMC জম্মু এবং GMC বারামুল্লা-র মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে। চিকিৎসকদের কর্মবিরতির জেরে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রোগীদের পরিষেবা যাতে পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সাত বছর ধরে অপরিবর্তিত স্টাইপেন্ড
আন্দোলনকারী ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, তাঁদের মাসিক স্টাইপেন্ড দীর্ঘদিন ধরে একই রয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ১২,৩০০ টাকা স্টাইপেন্ডেই কাজ করতে হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
ইন্টার্নদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ তাঁদের স্টাইপেন্ডে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান স্টাইপেন্ড তাঁদের কাজের চাপ ও দায়িত্বের তুলনায় অত্যন্ত কম বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।
তাঁদের দাবি, মাসিক স্টাইপেন্ড অন্তত ৩০ হাজার টাকা করা হোক এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর তা পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা হোক।
দীর্ঘ শিফট, ইমার্জেন্সি ও নাইট ডিউটির চাপ
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, হাসপাতালে তাঁদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমার্জেন্সি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড, নাইট ডিউটি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পরিষেবায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁদের।
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ডিউটি করতে হয় এবং ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ শিফটেও কাজ করার অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, এত দীর্ঘ সময় কাজ করার পরেও তুলনামূলকভাবে কম স্টাইপেন্ড পাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
ইন্টার্নদের দাবি, তাঁরা শুধু প্রশিক্ষণরত চিকিৎসক নন, হাসপাতালের দৈনন্দিন চিকিৎসা পরিষেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগী দেখা, জরুরি পরিষেবায় সহায়তা, চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল দায়িত্ব পালনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অন্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা টেনে ক্ষোভ
স্টাইপেন্ড বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা অন্যান্য রাজ্যের ইন্টার্নদের দেওয়া স্টাইপেন্ডের পরিমাণও তুলে ধরেছেন। তাঁদের দাবি, ওড়িশায় প্রায় ৪৪ হাজার টাকা এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৪৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরে মাত্র ১২,৩০০ টাকা স্টাইপেন্ড দেওয়ায় দুইয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। এই বৈষম্য দূর করে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্টাইপেন্ড বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
সরকারের তরফে আশ্বাস
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাকিনা ইতো জানিয়েছেন, ইন্টার্নদের দাবি সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্টাইপেন্ড বৃদ্ধির প্রস্তাবের ফাইল বর্তমানে অর্থ দপ্তরের (Finance Department) বিবেচনাধীন রয়েছে।
সরকারের এই বক্তব্যের পরও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি আপাতত প্রত্যাহার হয়নি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শুধু আশ্বাস নয়, স্টাইপেন্ড বৃদ্ধির বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সমর্থনও মিলছে
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস এবং পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (PDP)-র মতো রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনরত চিকিৎসকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য, চিকিৎসা পরিষেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করা ইন্টার্নদের দীর্ঘদিন ধরে একই হারে স্টাইপেন্ড দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। তাঁদের দাবি দ্রুত বিবেচনা করে সমস্যার সমাধান করা উচিত।
চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে উদ্বেগ
ইন্টার্নদের কর্মবিরতির ফলে সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা পরিষেবার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকা হাসপাতালগুলিতে ইন্টার্নদের অনুপস্থিতি পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁরা রোগীদের সমস্যায় ফেলতে চান না। তাঁদের দাবি ন্যায্য এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে তা জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না হওয়ায় বাধ্য হয়েই কর্মবিরতির পথে যেতে হয়েছে।
দ্রুত সমাধানের দিকে তাকিয়ে ইন্টার্নরা
বর্তমানে জম্মু-কাশ্মীরের স্বাস্থ্য দপ্তর এবং অর্থ দপ্তরের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন আন্দোলনকারী ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। সরকারের পক্ষ থেকে ফাইল বিবেচনার কথা জানানো হলেও, কবে এবং কতটা স্টাইপেন্ড বৃদ্ধি করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইন্টার্নদের দাবি, ১২,৩০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা স্টাইপেন্ড বৃদ্ধি করে তাঁদের কাজের চাপ ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁরা।
ফলে একদিকে চিকিৎসকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনের সামনে বড় পরীক্ষা। সরকারি তরফে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
