লালকেল্লা বিস্ফোরণের মিথ্যা অভিযোগে প্রবীণ দম্পতির ৩০ লক্ষ টাকা লুট
লালকেল্লা বিস্ফোরণে অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগ তুলে দিল্লির প্রবীণ দম্পতিকে ৭ দিন ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে ৩০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। জানুন প্রতারণার কৌশল ও বাঁচার উপায়।
লালকেল্লা বিস্ফোরণে অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগে প্রবীণ দম্পতির ৩০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিল প্রতারকরা

সিটি নিউজ বাংলা, নয়াদিল্লি, ন্যাশনাল ডেস্ক ১৫: সাইবার প্রতারণার নতুন আতঙ্ক ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। পুলিশ, সিবিআই, এনআইএ কিংবা ইডির আধিকারিক সেজে ভিডিও কলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের টার্গেট করে প্রতারকদের এই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। এবার দিল্লিতে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় লালকেল্লায় গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগ তুলে এক প্রবীণ রেলকর্মী দম্পতিকে প্রায় ৭ দিন ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে রেখে তাঁদের জীবনের সঞ্চয় থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতারকদের ভয় দেখানোর কৌশল এতটাই নিখুঁত ছিল যে, ওই দম্পতি কার্যত বুঝতেই পারেননি তাঁরা একটি বড়সড় সাইবার প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন। তদন্তের নামে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ভিডিও কলে যোগাযোগ রাখা হয় এবং কাউকে কিছু না জানানোর জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
কীভাবে শুরু হয় ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদ?
সাইবার প্রতারকদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হল ভয় এবং আতঙ্ক। প্রথমে ফোন করে নিজেদের পুলিশ, সিবিআই, এনআইএ, ইডি বা অন্য কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দেয় প্রতারকরা। এরপর জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আধার কার্ড, মোবাইল নম্বর বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কোনও গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।
কখনও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে মাদক পাচারের টাকা লেনদেন হয়েছে। কখনও অর্থ পাচার, জঙ্গি কার্যকলাপ কিংবা সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগানের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাঁকে জানানো হয়, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কার্যত ‘গ্রেফতার’।
বাস্তবে কোনও গ্রেফতার না হলেও ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ঘরে বসিয়ে নজরদারি করা হয়। দিনের পর দিন ফোন বা ভিডিও কল চালু রাখতে বলা হয়। এই ভুয়ো পরিস্থিতিকেই প্রতারকরা ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে ভয় দেখায়।
ভিডিও কলেই তৈরি হয় ভুয়ো থানার পরিবেশ
প্রতারকরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে। ভিডিও কলে পুলিশি পোশাক, ভুয়ো পরিচয়পত্র, সরকারি দফতরের মতো ব্যাকগ্রাউন্ড এবং নকল নথিপত্র দেখানো হয়।
কখনও আবার ভুয়ো ‘কোর্ট অর্ডার’ বা ‘গ্রেফতারি পরোয়ানা’ দেখিয়ে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীকে বলা হয়, বিষয়টি কাউকে জানালে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হবে।
এইভাবে ভয় দেখিয়ে তাঁকে পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ফলে প্রতারণার বিষয়টি বাইরে আসতে সময় লাগে।
‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’-এর নামে টাকা লুট
প্রতারকদের পরবর্তী লক্ষ্য থাকে ব্যাঙ্কের টাকা। তদন্তের নামে বলা হয়, নির্দোষ প্রমাণিত হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তার আগে সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা একটি নির্দিষ্ট ‘সুরক্ষা আমানত’ বা Security Deposit হিসেবে জমা দিতে হবে।
এই টাকা সাধারণত এমন কিছু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলা হয়, যেগুলি অন্য ব্যক্তিদের নামে খোলা হলেও প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের অ্যাকাউন্টকে সাইবার অপরাধের ভাষায় অনেক সময় ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ বলা হয়।
ভুক্তভোগী ভয় পেয়ে টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার পর প্রতারকরা আরও টাকা দাবি করতে থাকে। একসময় যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তখনই অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতে পারেন যে তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
দিল্লির প্রবীণ দম্পতির ঘটনায় চাঞ্চল্য
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাটি নতুন করে এই প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অভিযোগ, লালকেল্লায় গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে অর্থায়নের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে এক প্রবীণ রেলকর্মী দম্পতিকে দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও কলের মাধ্যমে ভয় দেখানো হয়।
প্রায় সাত দিন ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর পরিস্থিতিতে রেখে তাঁদের উপর মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আজীবনের সঞ্চয় থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা প্রতারকদের অ্যাকাউন্টে চলে যায় বলে অভিযোগ।
ঘটনাটি সামনে আসার পর ফের প্রশ্ন উঠেছে—বয়স্ক মানুষদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই ধরনের সাইবার প্রতারণা ঠেকাতে আরও বেশি সচেতনতা এবং দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ কতটা জরুরি।
দিল্লি পুলিশের সাইবার সেলও সক্রিয়
এই ধরনের আন্তঃরাজ্য ও আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের সাইবার ইউনিট অভিযান চালাচ্ছে। তদন্তে একাধিক ক্ষেত্রে পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রতারকদের সন্ধান মিলেছে বলে জানা গিয়েছে।
অভিযোগ, প্রতারণার কাজে ব্যবহারের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে সেগুলি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। টেলিগ্রামের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও অ্যাকাউন্ট কেনাবেচার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
এই অর্থের লেনদেনের সঙ্গে বিদেশে সক্রিয় সাইবার প্রতারণা চক্রের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
৯২ বছরের বৃদ্ধের ২ কোটি টাকা উদ্ধার
সাইবার প্রতারণার বিরুদ্ধে তদন্তে পুলিশের সাফল্যের ঘটনাও সামনে এসেছে। দিল্লি পুলিশের আইএফএসও ইউনিট একটি মামলায় এক ৯২ বছর বয়সী বৃদ্ধের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া প্রায় ২ কোটি টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, সময়মতো অভিযোগ জানানো হলে প্রতারণার টাকা আটকে দেওয়া বা উদ্ধার করার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে। তাই প্রতারণার বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত পুলিশকে জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৮০টিরও বেশি জায়গায় সিবিআইয়ের অভিযান
ডিজিটাল অ্যারেস্ট ও সাইবার প্রতারণার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিও অভিযান চালাচ্ছে। সিবিআইয়ের ‘অপারেশন চক্র-VI’-এর আওতায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালিয়ে সাইবার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, অর্থের লেনদেন, সিম কার্ড, মোবাইল ফোন এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে কিছু নেই
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে—কোনও পুলিশ বা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ভিডিও কলের মাধ্যমে কাউকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে না।
কেউ ফোন করে যদি বলে—
আপনার আধার বা মোবাইল নম্বর অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে,
আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সন্ত্রাসবাদী বা মাদক পাচারের টাকা এসেছে,
আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে,
তদন্তের জন্য সমস্ত টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে,
ভিডিও কলে থাকতে হবে এবং কাউকে কিছু বলা যাবে না,
তাহলে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
কোনও অবস্থাতেই আতঙ্কিত হয়ে টাকা পাঠানো যাবে না।
প্রতারিত হলে ১৯৩০ নম্বরে দ্রুত ফোন করুন
সাইবার প্রতারণার শিকার হলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সন্দেহজনক লেনদেন হয়ে গেলে দ্রুত জাতীয় সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন ১৯৩০ নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় সাইবার অপরাধ রিপোর্টিং পোর্টালে অভিযোগ জানানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত অভিযোগ জানানো গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি বার্তা
অচেনা নম্বর থেকে ফোন → ভয় দেখানো → ভুয়ো পুলিশ/সিবিআই পরিচয় → ভিডিও কল → ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ → টাকা ট্রান্সফারের চাপ—এই ধারাবাহিকতাই হতে পারে বড় সাইবার প্রতারণার সংকেত।
তাই কোনও অচেনা ব্যক্তি ফোন করে যতই ভয় দেখাক, OTP, PIN, CVV, ব্যাঙ্কের পাসওয়ার্ড, আধার সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য বা অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের তথ্য দেওয়া যাবে না। কোনও সরকারি সংস্থা ফোন বা ভিডিও কলে তদন্তের নামে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের সমস্ত টাকা ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ হিসেবে জমা দিতে বলে না।
ভয় নয়, সচেতনতাই ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা ঠেকানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
