নিউ টাউনে ২৫ কোটির ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’, সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিঠুন
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে নিউ টাউনে তৈরি হচ্ছে ২৫ কোটি টাকার ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’। থাকছে সিনেমা হল, অডিটোরিয়াম, ওপেন এয়ার থিয়েটার, VFX, অ্যানিমেশন ও XR ল্যাব।
মহানায়কের নামে নিউ টাউনে তৈরি হচ্ছে মেগা ফিল্ম সেন্টার!
২৫ কোটি টাকার প্রকল্পের ভূমিপুজো ও শিলান্যাস, সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিঠুন চক্রবর্তী

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৫: মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজ্যের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতে বড় উদ্যোগ। মহানায়কের নামেই নিউ টাউনে তৈরি হতে চলেছে অত্যাধুনিক ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’। শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিউ টাউনের ইকো পার্ক সংলগ্ন এলাকায় এই মেগা প্রকল্পের ভূমিপুজো ও শিলান্যাস অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, টলিউডের একাধিক বিশিষ্ট তারকা এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের পরিবারের সদস্যরা। মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এই প্রকল্পকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ
‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’ তৈরির জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে হিডকো (HIDCO)-র হাতে।
প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বর্ষার মরশুম শেষ হওয়ার পর নির্মাণকাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নিউ টাউনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই চলচ্চিত্রকেন্দ্র গড়ে উঠলে তা ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রপ্রেমী, শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ এবং সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্পের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মিঠুন চক্রবর্তী
এই মেগা চলচ্চিত্রকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রকল্পটির কালচারাল অ্যাডভাইসার বা সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিঠুন চক্রবর্তীর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় সিনেমার বিভিন্ন পর্ব সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এই প্রকল্পের সাংস্কৃতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নন্দনের আদলে, তবে আরও আধুনিক পরিকাঠামোয়
প্রস্তাবিত ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’কে কলকাতার ‘নন্দন’-এর আদলে একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে শুধু সিনেমা প্রদর্শন নয়, আধুনিক প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চলচ্চিত্রের পোস্ট-প্রোডাকশন—সবকিছুকেই এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো প্রকল্পটি মূলত তিনটি বড় অংশে ভাগ করা হবে।
প্রথম অংশে থাকছে দুটি আধুনিক সিনেমা হল
প্রকল্পের প্রথম অংশে তৈরি হবে ৭৫০ আসনবিশিষ্ট দুটি আধুনিক সিনেমা হল। অর্থাৎ, দু’টি হল মিলিয়ে মোট ১,৫০০ দর্শকের আসন থাকবে।
এর পাশাপাশি থাকবে একটি প্রিভিউ থিয়েটার, যেখানে নতুন সিনেমা বা বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে। দর্শকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এই অংশে ফুড কোর্ট এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
ফলে সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের জন্য এটি শুধু একটি প্রেক্ষাগৃহ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় অংশে অডিটোরিয়াম ও ওপেন এয়ার থিয়েটার
প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশে থাকছে বড় আকারের সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। এখানে তৈরি হবে ১,০০০ আসনবিশিষ্ট একটি অডিটোরিয়াম।
নাটক, নৃত্য, সংগীতানুষ্ঠান, চলচ্চিত্র উৎসব, আলোচনা সভা কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের জন্য এই অডিটোরিয়াম ব্যবহার করা যাবে।
এর পাশাপাশি থাকছে ওপেন এয়ার থিয়েটার। খোলা আকাশের নিচে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মতো কর্মসূচি আয়োজনের সুযোগ থাকবে সেখানে।
তৃতীয় অংশে প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্রকেন্দ্র
এই প্রকল্পের সবচেয়ে আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী অংশ হতে চলেছে তৃতীয় পর্ব। চলচ্চিত্রের পোস্ট-প্রোডাকশন এবং নতুন প্রজন্মের বিনোদন প্রযুক্তিকে সামনে রেখে এখানে তৈরি করা হবে একাধিক ল্যাবরেটরি ও স্টুডিও।
এর মধ্যে থাকবে—
- অ্যানিমেশন ল্যাব
- VFX বা ভিজ্যুয়াল এফেক্টস ল্যাব
- গেমিং সংক্রান্ত প্রযুক্তি ও স্টুডিও
- কমিকস তৈরির পরিকাঠামো
- Extended Reality বা XR ল্যাবরেটরি ও স্টুডিও
ফলে আগামী দিনে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং এবং ভার্চুয়াল বা এক্সটেন্ডেড রিয়্যালিটির মতো নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শুধু স্মৃতিরক্ষা নয়, ভবিষ্যতের সিনেমার ঠিকানা
মহানায়ক উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং চলচ্চিত্রজীবন আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জন্মশতবর্ষে তাঁর নামে একটি আধুনিক চলচ্চিত্রকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ তাই নিছক স্মৃতিরক্ষা নয়, বরং বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই কেন্দ্রের মাধ্যমে একই জায়গায় সিনেমা প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আধুনিক চলচ্চিত্র প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিকাঠামো গড়ে উঠবে। ফলে শিল্পী থেকে শুরু করে প্রযুক্তিবিদ—চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের জন্য এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
টলিউডে নতুন আশার সঞ্চার
বাংলা চলচ্চিত্রে বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অ্যানিমেশন, VFX, গেমিং এবং XR-এর মতো ক্ষেত্রের গুরুত্বও ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নিউ টাউনে এমন একটি অত্যাধুনিক কেন্দ্র তৈরি হলে বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।
মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শুরু হওয়া এই প্রকল্প ভবিষ্যতে বাংলা চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তার সংযোগ ঘটাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ, তিনটি পৃথক পরিকাঠামো, ১,৫০০ আসনের দুটি সিনেমা হল, ১,০০০ আসনের অডিটোরিয়াম, ওপেন এয়ার থিয়েটার এবং অত্যাধুনিক অ্যানিমেশন-VFX-XR ল্যাব—সব মিলিয়ে ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’ আগামী দিনে নিউ টাউনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। মহানায়কের জন্মশতবর্ষে তাঁর নামে এই উদ্যোগ তাই বাংলা সিনেমার অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার এক বড় পদক্ষেপ।
