‘নটি বয়’-এর দাপট শেষ! সফল GSLV-F17 উৎক্ষেপণ, মহাকাশে EOS-05
শ্রীহরিকোটা থেকে সফল GSLV-F17 উৎক্ষেপণ। ২,৩৬৭ কেজির EOS-05 স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছল। বড় সাফল্য ইসরোর।
‘নটি বয়’-এর দাপট শেষ! GSLV-F17-এর সফল উৎক্ষেপণ মহাকাশে

শ্রীহরিকোটা, ন্যাশনাল ডেস্ক ৪: ফের মহাকাশ অভিযানে বড় সাফল্য ভারতের। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সফলভাবে উৎক্ষেপণ হল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)-র শক্তিশালী রকেট GSLV-F17। শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে, শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে সফলভাবে মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দেয় রকেটটি। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে ভারতের উন্নত আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট EOS-05।
এই উৎক্ষেপণকে ইসরোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, প্রায় ২,৩৬৭ কিলোগ্রাম ওজনের EOS-05 এখনও পর্যন্ত GSLV পরিবারের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা সবচেয়ে ভারী পেলোড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী উপগ্রহটি কক্ষপথে পৌঁছনোয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।
ভোররাতে শ্রীহরিকোটা থেকে মহাকাশে উড়ল GSLV-F17
শুক্রবার গভীর রাত পেরিয়ে ভোরের আকাশে যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে, তখন শ্রীহরিকোটায় চলছিল ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানের কাউন্টডাউন। নির্ধারিত সময় ভোর ২টা ৫৫ মিনিটে প্রবল গর্জনে দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে আকাশের দিকে উঠে যায় GSLV-F17।
একাধিক ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পর রকেটটি EOS-05 উপগ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে দেয়। উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পরই ইসরোর মিশন কন্ট্রোলে উচ্ছ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়। বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল মিলেছে এই সাফল্যে।
২,৩৬৭ কেজির EOS-05—কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই অভিযানের মূল আকর্ষণ EOS-05 আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট। প্রায় ২,৩৬৭ কেজি ওজনের এই উপগ্রহ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য কৃষি, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বন্যা, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দ্রুত পরিস্থিতি বোঝা এবং ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে এই ধরনের উপগ্রহের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথ থেকে নজরদারিতে নতুন অধ্যায়
EOS-05 মিশনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—এটি জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথ থেকে পরিচালিত ভারতের প্রথম ডেডিকেটেড ইমেজিং স্যাটেলাইট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চমানের ছবি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই উপগ্রহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করতে পারে। কৃষিজমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে পরিবেশগত পরিবর্তন চিহ্নিত করা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর তথ্য ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—একাধিক ক্ষেত্রে কাজে আসবে তথ্য
EOS-05-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের অন্যতম বড় ব্যবহার হতে পারে কৃষিক্ষেত্রে। ফসলের পরিস্থিতি, জমির পরিবর্তন, জলসম্পদের অবস্থা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে উপগ্রহটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একইসঙ্গে বনাঞ্চল, জলাভূমি, নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নজর রাখতেও স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। কোনও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবি পাওয়া গেলে উদ্ধার ও ত্রাণকাজের পরিকল্পনাতেও তা সহায়ক হতে পারে।
‘নটি বয়’ অবশেষে সফল!
GSLV-F17-এর এই সাফল্যের সঙ্গে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অতীতে একাধিক উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে GSLV-কে কখনও কখনও মজা করে ‘নটি বয়’ বা ‘দুষ্ট ছেলে’ বলা হয়েছিল। সেই অতীতের ব্যর্থতার স্মৃতি পেরিয়ে এবার ফের বড় সাফল্যের নজির তৈরি করল GSLV।
এই সফল উৎক্ষেপণ GSLV কর্মসূচির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইসরোর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারী পেলোডকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করা এই মিশনের অন্যতম বড় সাফল্য।
ইসরো বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন প্রধানমন্ত্রীর
GSLV-F17-এর সফল উৎক্ষেপণের পর ইসরোর বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশের মহাকাশ গবেষণায় এই সাফল্যকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন-সহ সংস্থার বিজ্ঞানী ও কর্মীদের মধ্যেও এই সাফল্য নিয়ে সন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং একাধিক পর্যায়ের যাচাইয়ের পর এই মিশন সফল হওয়ায় ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার সক্ষমতা আরও একবার বিশ্বের সামনে উঠে এল।
মহাকাশ গবেষণায় ভারতের শক্তি আরও বাড়ল
EOS-05-এর সফল উৎক্ষেপণ শুধুমাত্র একটি উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর ঘটনা নয়। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি এবং ভারী পেলোড উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতারও নতুন প্রদর্শন এই মিশন।
কৃষি, পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো নাগরিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ক্ষেত্রে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই এই ধরনের আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের গুরুত্ব বাড়বে।
সব মিলিয়ে, ৪ সেপ্টেম্বরের GSLV-F17 উৎক্ষেপণ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় যোগ করল। একদিকে ‘নটি বয়’-এর অতীত ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সফল উৎক্ষেপণ, অন্যদিকে ২,৩৬৭ কেজির EOS-05-কে মহাকাশে পৌঁছে দেওয়া—দুই মিলিয়ে ইসরোর জন্য দিনটি নিঃসন্দেহে সাফল্যের।
