তৃষ্ণা মিশন: ভারত-ফ্রান্সের যৌথ উপগ্রহে নজরে জল, কৃষি ও জলবায়ু
ভারত-ফ্রান্সের যৌথ TRISHNA উপগ্রহ মিশনে পৃথিবীর জলসম্পদ, কৃষি, ভূমির তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের উপর উচ্চ-রেজোলিউশনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
‘তৃষ্ণা’ – ভারত-ফ্রান্সের যৌথ উপগ্রহ মিশন ঘিরে বড় প্রস্তুতি

জলের উৎস, জল ব্যবহারের ধরন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া জলসংকট সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পেতে এবার মহাকাশ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে চলেছে ভারত ও ফ্রান্স। দুই দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO) এবং ফ্রান্সের CNES-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে ‘তৃষ্ণা’ (TRISHNA—Thermal Infra-Red Imaging Satellite for High-resolution Natural Resource Assessment) উপগ্রহ। মিশনটির লক্ষ্য পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা, জলচক্র, জল ব্যবহারের ধরন এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে উচ্চ-রেজোলিউশনের তথ্য সংগ্রহ করা।
সাম্প্রতিক ভারত-ফ্রান্স মহাকাশ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনাতেও TRISHNA মিশনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং এবং ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মহাকাশমন্ত্রী অধ্যাপক ফিলিপ বাতিস্তের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের বৈঠকে দুই দেশের মহাকাশ সহযোগিতা এবং TRISHNA-সহ একাধিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়।
জলসম্পদ পর্যবেক্ষণে নতুন দিশা
TRISHNA-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হল স্থলভাগের জল ও শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। উপগ্রহটির তথ্যের মাধ্যমে ভূমির জলচাপ বা Water Stress, কৃষিক্ষেত্রে জলের ব্যবহার এবং বাষ্পীভবন-উদ্বাসন (Evapotranspiration) সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যাবে। এর ফলে কোন অঞ্চলে কতটা জল ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোথায় জলসংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তা বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে এই মিশন।
শুধু ভূগর্ভস্থ জলের পরিস্থিতি নয়, উপগ্রহটি নদী, হ্রদ, জলাশয় এবং উপকূলীয় জলভাগের জলমান ও জলগতিবিদ্যা পর্যবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারবে। ISRO-র তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের নীচে থাকা ভূগর্ভস্থ জলের নির্গমন শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এই মিশনের ভূমিকা থাকতে পারে।
থার্মাল ইনফ্রারেড প্রযুক্তিই বড় শক্তি
TRISHNA-র প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর উচ্চ-রেজোলিউশনের Thermal Infra-Red (TIR) পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। CNES-এর তৈরি TIR পেলোডে চারটি দীর্ঘ-তরঙ্গ ইনফ্রারেড চ্যানেল থাকবে, যার সাহায্যে পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বিভিন্ন পৃষ্ঠের তাপীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি ISRO তৈরি করছে Visible-Near Infra-Red-Short Wave Infra-Red (VNIR-SWIR) পেলোড। এতে সাতটি স্পেকট্রাল ব্যান্ড থাকবে। দুই পেলোডের তথ্য একত্র করে ভূমির তাপমাত্রা, উদ্ভিদ, জল ও শক্তির ভারসাম্যসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হবে।
৭৬১ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে কাজ করবে
ISRO-র প্রকাশিত মিশন-তথ্য অনুযায়ী, TRISHNA-কে পৃথিবীর প্রায় ৭৬১ কিলোমিটার উচ্চতার Sun-Synchronous Orbit-এ স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষেত্রে এর পর্যবেক্ষণ রেজোলিউশন প্রায় ৫৭ মিটার, আর মহাসাগর ও মেরু অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রায় ১ কিলোমিটার হবে। মিশনটির পরিকল্পিত কার্যকাল পাঁচ বছর।
অর্থাৎ, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জল ও ভূমির পরিবর্তনকে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘমেয়াদি একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা সম্ভব হবে। কৃষি, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ গবেষণা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সেই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রেও মিলবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
জলসম্পদের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে TRISHNA-র তথ্যের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোন জমিতে গাছপালা কতটা জল ব্যবহার করছে, কোথায় জলঘাটতির চাপ বাড়ছে এবং কৃষিতে জল ব্যবহারের দক্ষতা কতটা—এসব বিষয় বিশ্লেষণে উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করা যাবে।
ISRO জানিয়েছে, TRISHNA-র ডেটা কৃষি পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু সংক্রান্ত গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা উদ্যোগেও কাজে লাগতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষক, জলসম্পদ ব্যবস্থাপক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য আরও নির্ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতেও সহায়ক
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, জলসংকট, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং হিমবাহ গলার মতো সমস্যা বাড়ছে। TRISHNA-র উচ্চ-রেজোলিউশনের তাপীয় পর্যবেক্ষণ এই ধরনের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য দিতে পারে।
এছাড়াও শহরাঞ্চলে Urban Heat Island, আগ্নেয়গিরির সঙ্গে যুক্ত তাপীয় অস্বাভাবিকতা, ভূ-তাপীয় সম্পদ, তুষার গলার হার এবং হিমবাহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণেও এই মিশনের তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
ভারত-ফ্রান্স মহাকাশ সহযোগিতায় আরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
TRISHNA ভারত ও ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের মহাকাশ সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। ISRO এবং CNES-এর যৌথভাবে এই মিশন বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। ISRO-র সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, উপগ্রহের বিভিন্ন অংশ এবং VNIR-SWIR পেলোডের Preliminary Design Review সম্পন্ন হয়েছে এবং মিশন বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
ভারত-ফ্রান্স মহাকাশ সহযোগিতা শুধু উপগ্রহ তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতে মানব মহাকাশযাত্রা, উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি, শিল্পক্ষেত্র এবং স্টার্টআপ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ সম্পর্ক আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে।
সব মিলিয়ে, ‘তৃষ্ণা’ শুধুমাত্র একটি উপগ্রহ মিশন নয়—পৃথিবীর জল, ভূমি, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝার জন্য এটি ভারত-ফ্রান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ। ভবিষ্যতে এই উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য জলসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জলসংকট মোকাবিলার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
