দুর্গাপুজোর ভুয়ো পাস বিক্রির অভিযোগ, ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়িতে ED তল্লাশি
দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো ও পুজো পরিক্রমার নামে ভুয়ো পাস বিক্রির অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়িসহ কলকাতার ১৫টি ঠিকানায় ED-র তল্লাশি।
দুর্গাপুজোর ভুয়ো পাস বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়িতে ED-র তল্লাশি

কলকাতা, ২৯ সেপ্টেম্বর, ন্যাশনাল ডেস্ক ২ : দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ এবং পুজো পরিক্রমার নামে ভুয়ো পাস বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকাল থেকেই তৎপর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়িতে এদিন সকালে পৌঁছে তল্লাশি অভিযান শুরু করেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। একইসঙ্গে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় একাধিক ঠিকানাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ১৫টি জায়গায় তল্লাশির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্গাপুজোর বিভিন্ন মণ্ডপের ‘প্রিভিউ শো’ বা পুজো পরিক্রমার জন্য পাস ও টিকিট বিক্রির একটি ব্যবস্থা। তদন্তকারী সংস্থার সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই পাস বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
অভিযোগের কেন্দ্রে ‘মাস আর্ট’
এই মামলায় ‘Mahanirban Road Mass Art Society’ বা ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্গাপুজোকে ঘিরে ওই সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পাস ও পরিষেবা বাজারজাত করা হয়েছিল। জুন মাসে কলকাতা পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন এবং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনের নাম উঠে আসে।
প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, সংস্থাটি ২০২২ সাল থেকে নিজেদের ইউনেস্কোর সঙ্গে যুক্ত বা ‘অফিশিয়াল পার্টনার’ হিসেবে প্রচার করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এই পরিচয় ব্যবহার করে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের পাস বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছিল।
ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার নিয়েও তদন্ত
কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘Intangible Cultural Heritage’ স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শহরের পুজোকে তুলে ধরার নানা উদ্যোগ দেখা যায়। সেই আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ এবং পর্যটকদের কাছে বিশেষ পাস বিক্রি করা হয়েছিল কি না, কিংবা সেই পাসগুলির সঙ্গে সত্যিই কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা অংশীদারিত্ব ছিল কি না—তা নিয়েও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে ইউনেস্কোর নাম বা লোগো ব্যবহারের অভিযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
১৫টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি
ইডি-র মঙ্গলবারের অভিযানের পরিধি শুধু কসবার বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কলকাতার প্রায় ১৫টি ঠিকানায় একযোগে তল্লাশির কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে হিন্দুস্তান পার্ক, হাইল্যান্ড পার্ক-সহ একাধিক ঠিকানা রয়েছে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ঠিকানাতেও তদন্তকারীরা পৌঁছেছেন বলে খবর।
তল্লাশির সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা ছিল। বিভিন্ন নথি, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কাগজপত্র, ডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য সম্ভাব্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
জুনে দায়ের হয়েছিল FIR
এই মামলার সূত্রপাত চলতি বছরের জুন মাসে। কলকাতা পুলিশের কাছে দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী এবং ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে FIR নথিভুক্ত হয়। অভিযোগকারী হিসেবে জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগে মূলত দুর্গাপুজোর নামে টাকা সংগ্রহ এবং ইউনেস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
পরবর্তী পর্যায়ে অভিযোগের আর্থিক দিক এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের বিষয়টি সামনে আসায় ED তদন্তে নামে। বর্তমানে অর্থের উৎস, কোথা থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেই টাকা কোথায় গিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থাগুলির মধ্যে কীভাবে লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের ফলাফলের দিকেই নজর
মঙ্গলবারের তল্লাশি অভিযানের মাধ্যমে তদন্তকারীরা মূলত নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করছেন বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাস বিক্রির অর্থ, সংশ্লিষ্ট সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং দুর্গাপুজো-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এখনও পর্যন্ত এই অভিযানের বিষয়ে ইন্দ্রনীল সেন বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এই মামলায় আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। ED-র তল্লাশিতে কী কী নথি বা তথ্য উদ্ধার হয় এবং তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্তে পৌঁছন, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
