উদ্ধব-রাজ ঠাকরের ‘বিরাট গর্জন মোর্চা’, SIR-EVM ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীরা
উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের যৌথ নেতৃত্বে মুম্বইয়ে ‘বিরাট গর্জন মোর্চা’। নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ, SIR বাতিল ও EVM-এর বদলে ব্যালটের দাবিতে সরব বিরোধীরা।
ঠাকরে ভাইদের ‘বিরাট গর্জন মোর্চা’, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব বিরোধীরা

মুম্বই, ৫ অক্টোবর, ন্যাশনাল ডেস্ক ৫ : মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলল। দীর্ঘদিন পর একই মঞ্চে দেখা গেল শিবসেনা (UBT) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (MNS) প্রধান রাজ ঠাকরেকে। রবিবার, ৪ অক্টোবর মুম্বইয়ে দুই ঠাকরে ভাইয়ের যৌথ নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হল বিশাল প্রতিবাদ মিছিল—‘বিরাট গর্জন মোর্চা’। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার সংশোধন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।
মুম্বইয়ের মেট্রো সিনেমা থেকে শুরু হয় এই মিছিল। পরে দক্ষিণ মুম্বইয়ের বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (BMC) সদর দফতর পর্যন্ত এগিয়ে যায় প্রতিবাদ মিছিল। কর্মসূচিকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থকের সমাগম হয়। শুধু উদ্ধব ও রাজ ঠাকরে শিবিরই নয়, বিরোধী শিবিরের একাধিক দলও এই কর্মসূচিতে যোগ দেয়।
কী দাবিতে পথে বিরোধীরা?
এই প্রতিবাদ মিছিলের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। পাশাপাশি ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR বাতিলের দাবিও তোলা হয়।
বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকার সংশোধনের নামে এমন একটি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, যার ফলে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী তালিকায় অনিয়ম এবং ভোটারদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশনের ভূমিকারও তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধী নেতারা।
এক মঞ্চে উদ্ধব-রাজ
‘বিরাট গর্জন মোর্চা’-র সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের একসঙ্গে মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া। ঠাকরে পরিবারের দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক পথ দীর্ঘদিন ধরে আলাদা হলেও এদিন নির্বাচনী ইস্যুকে সামনে রেখে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়।
এই যৌথ কর্মসূচি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলেও রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
মিছিলে যোগ বিরোধী দলগুলির
ঠাকরে ভাইদের পাশাপাশি মহাবিকাশ আঘাড়ি (MVA)-র শরিক কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন NCP-SP-এর নেতারাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। বামপন্থী দলগুলির নেতারাও প্রতিবাদ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন।
ফলে মুম্বইয়ের এই কর্মসূচি কার্যত বিজেপি ও শাসক জোটের বিরুদ্ধে বিরোধীদের বৃহত্তর ঐক্যের একটি প্রদর্শন হয়ে ওঠে।
উদ্ধবের নিশানায় নির্বাচন কমিশন
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উদ্ধব ঠাকরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কটাক্ষ করে তাঁকে ‘বিজেপির অস্ত্র’ বলেও মন্তব্য করেন।
উদ্ধবের বক্তব্যে ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। বিরোধীদের দাবি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের অধিকার এবং ভোটার তালিকার নিরপেক্ষতা কোনওভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়া উচিত নয়।
EVM নিয়ে রাজ ঠাকরের বড় দাবি
অন্যদিকে, MNS প্রধান রাজ ঠাকরে নির্বাচনে EVM ব্যবহারের বিরোধিতা করে ফের ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবি তোলেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হলে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
EVM-এর বদলে ব্যালট পেপারে ভোট করার দাবিকে সামনে রেখে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে বিরোধীদের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
মিছিল ঘিরে FIR, বাড়ল রাজনৈতিক চাপানউতোর
এদিকে, অনুমতি ছাড়াই কর্মসূচি আয়োজনের অভিযোগে মুম্বই পুলিশ আয়োজকদের বিরুদ্ধে FIR দায়ের করেছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি আইনি বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে।
অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ বিরোধীদের এই মিছিলকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মতে, এই ধরনের কর্মসূচি মূলত বিরোধীদের ‘রাজনৈতিক হতাশার বহিঃপ্রকাশ’।
ফড়নবিশের মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছে বিরোধী শিবিরও। ফলে ‘বিরাট গর্জন মোর্চা’-কে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শাসক-বিরোধী সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
সব মিলিয়ে ৪ অক্টোবরের মুম্বই মিছিল শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের এক মঞ্চে আসা এই কর্মসূচিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
আগামী দিনে এই দুই শিবিরের রাজনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে এগোয় এবং বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ক্ষেত্রে এর কী প্রভাব পড়ে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। নির্বাচন কমিশন, SIR, EVM এবং ভোটার তালিকা—এই চার ইস্যুকে সামনে রেখে মহারাষ্ট্রে শাসক ও বিরোধীদের রাজনৈতিক লড়াই যে আরও জোরদার হতে চলেছে, ‘বিরাট গর্জন মোর্চা’ তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
