কোচবিহারে প্রবীণ বিজেপি নেতা হরিপদ পালের প্রয়াণ, রাজনৈতিক মহলে শোক
কোচবিহারের প্রবীণ বিজেপি নেতা ও রামভোলা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক হরিপদ পালের প্রয়াণ। জনসংঘ থেকে বিজেপির প্রতিষ্ঠা ও সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর।
কোচবিহারের প্রবীণ বিজেপি নেতা , তথা বিশিষ্ট শিক্ষক হরিপদ পালের প্রয়াণ

কোচবিহার: জনসংঘের সময়কাল থেকে বিজেপির প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার—গেরুয়া শিবিরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন কোচবিহারের প্রবীণ রাজনীতিবিদ হরিপদ পাল। রবিবার রাতে তাঁর প্রয়াণে কোচবিহারের রাজনৈতিক মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই প্রবীণ নেতা জনসংঘ থেকে বিজেপি হয়ে দলের সাংগঠনিক উত্থানের নানা পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কোচবিহারের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
পেশায় তিনি ছিলেন কোচবিহারের রামভোলা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতিই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান আগ্রহ। জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই আদর্শ থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হন হরিপদ পাল। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ভারতীয় জনসংঘের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় থেকেই কোচবিহারের রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর সক্রিয় পথচলা শুরু।
১৯৬৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহার পশ্চিম কেন্দ্র থেকে জনসংঘের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন হরিপদ পাল। সেই সময় বাংলার রাজনীতিতে জনসংঘের সাংগঠনিক পরিসর আজকের তুলনায় অনেকটাই সীমিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে দলের আদর্শকে সামনে রেখে মানুষের কাছে পৌঁছনো এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যান তিনি।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন হরিপদ পাল। বিজেপির প্রতিষ্ঠালগ্নেই তিনি কোচবিহার জেলা কমিটির প্রথম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠনকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং দলীয় কর্মীদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি কোচবিহার জেলা বিজেপির দ্বিতীয় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জেলার রাজনীতিতে দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।
শুধু সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি হরিপদ পাল। নির্বাচনী রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। একাধিক নির্বাচনে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জেলার রাজনৈতিক ময়দানে দলের উপস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। সেই সময়ের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংগঠন গড়ে তোলার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিজেপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিন অটুট ছিল।
জনসংঘের সময় থেকে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তার—এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও নানা পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে দলকে সীমিত সাংগঠনিক পরিসরের মধ্যে কাজ করতে হতো, পরবর্তী সময়ে সেই দলের জাতীয় স্তরে ক্ষমতায় আসার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন হরিপদ পাল। কোচবিহারেও বিজেপির সাংগঠনিক যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
শিক্ষকতার পেশা এবং রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় রেখে চলা হরিপদ পালের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা জেলার পুরনো প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন প্রবীণ নেতার মৃত্যু হল না, জনসংঘের প্রথম দিকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিজেপির প্রতিষ্ঠার সময়কার বহু স্মৃতিরও অবসান ঘটল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
