সিপিএমের সাংগঠনিক রিপোর্টে বাংলায় যুব সদস্যের ঘাটতি, ৮.৭% থেকে কমে ৮.২%
সিপিএমের সাংগঠনিক রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গে যুব সদস্যের হার কমার তথ্য। ২০২১ সালের ৮.৭% থেকে ২০২৪ সালে তা নেমে ৮.২%, যেখানে জাতীয় স্তরে হার বেড়েছে ২২.৬%-এ।
সিপিএমের সাংগঠনিক রিপোর্টে তারুণ্যের ঘাটতি, পশ্চিমবঙ্গে কমছে যুব সদস্যের হার

কলকাতা, স্টেট ডেস্ক ৬ : তরুণ প্রজন্মকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সিপিআই(এম)। দলের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক রিপোর্টেই উঠে এসেছে, পশ্চিমবঙ্গে পার্টির সদস্যদের মধ্যে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব ক্রমশ কমছে। ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের জন্য তৈরি সাংগঠনিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩১ বছরের কম বয়সি সদস্যের হার ছিল ৮.৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২ শতাংশে। দলের রিপোর্টেই বলা হয়েছে, এই পতন নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের সামগ্রিক চিত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গিয়েছে। সিপিআই(এম)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে গোটা দেশে ৩১ বছরের কম বয়সি সদস্যের হার ছিল ১৯.৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে যুব সদস্যের প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও পশ্চিমবঙ্গে সেই প্রবণতার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
কেরলে যুব সদস্যের হার প্রায় ৩০ শতাংশ
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কেরলের ব্যবধান আরও স্পষ্ট। দলের সাংগঠনিক রিপোর্ট বলছে, কেরলে ৩১ বছরের কম বয়সি সদস্যের হার ২০২১ সালের ২৩.৭৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৯.৮ শতাংশ হয়েছে। দলের হিসাব অনুযায়ী, কলকাতা প্লেনামে নির্ধারিত যুব প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা একমাত্র রাজ্য কেরল। বিহারেও তরুণ সদস্যদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি—সেখানে এই হার ১৮.২ শতাংশ।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে যুব সদস্যের হার ৮.৭ শতাংশ থেকে ৮.২ শতাংশে নেমে আসায় সংগঠনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। দলের নিজস্ব রিপোর্টেই যুব সদস্য সংগ্রহের বিষয়টিকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সামনের সারিতে তরুণ মুখ, কিন্তু সংগঠনের তৃণমূলে কতটা প্রবেশ?
গত কয়েক বছরে সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গে একাধিক তরুণ মুখকে সামনে এনেছে। আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। তবে নেতৃত্বের সামনে তরুণ মুখ তুলে ধরার পাশাপাশি তৃণমূল স্তরে স্থায়ীভাবে নতুন সদস্য তৈরি করাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, দলের সাংগঠনিক রিপোর্টে তারই ইঙ্গিত মিলছে।
কারণ কোনও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি শুধু পরিচিত বা প্রচারের মুখের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। স্থানীয় স্তরে নিয়মিত কাজ করা, রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার মতো সদস্য তৈরি হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিআই(এম)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে সদস্যদের রাজনৈতিক শিক্ষা, সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত দলীয় কাজে যুক্ত রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনে তরুণদের উপস্থিতি বনাম স্থায়ী সদস্যপদ
সিপিএমের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তরুণদের অংশগ্রহণ থাকলেও সেই অংশগ্রহণকে কতটা স্থায়ী দলীয় সদস্যপদে রূপান্তর করা যাচ্ছে, সেটিই এখন অন্যতম সাংগঠনিক প্রশ্ন। দলের কেন্দ্রীয় রিপোর্টে বলা হয়েছে, বহু রাজ্যে যুব সদস্যের সংখ্যা কমেছে এবং তরুণদের আকৃষ্ট করতে আরও নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
দলের সাংগঠনিক নথিতে আরও বলা হয়েছে, শুধু রাজনৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডে সদস্যদের ধারাবাহিকভাবে যুক্ত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। দল মনে করে, সক্রিয় গণআন্দোলন নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং তাঁদের সংগঠনে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
নেতৃত্বে বয়স কমানোর পাশাপাশি তৃণমূলেও নজর
নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আনার বিষয়টি সিপিআই(এম)-এর সাংগঠনিক সংস্কারের অন্যতম আলোচ্য। কিন্তু নেতৃত্বের বয়স কমানোর পাশাপাশি নিচুতলার সদস্য কাঠামোয় তরুণদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন কতটা সম্ভব, সেটিও দলের সামনে বড় প্রশ্ন।
দলের নিজস্ব সাংগঠনিক নথিতে সদস্যদের মানোন্নয়ন, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক শিক্ষা এবং নিয়মিত দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের সদস্যপদ নবীকরণ প্রক্রিয়াতেও এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
২০১৫ সালের সাংগঠনিক প্লেনামেও ছিল সংগঠন শক্তিশালী করার প্রশ্ন
তরুণ ও সক্রিয় সদস্য তৈরির প্রশ্নটি সিপিএমের কাছে নতুন নয়। ২০১৫ সালের কলকাতা সাংগঠনিক প্লেনামের রিপোর্টেও পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠনকে সক্রিয় করা, নিষ্ক্রিয় সদস্যদের বাদ দেওয়া এবং সদস্যদের গুণগত মান উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। সেই রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনের সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নত করতে গণসংগঠনের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সদস্য ও দলীয় ইউনিটগুলিকে আরও সক্রিয় করার কথা বলা হয়েছিল।
সামনে বড় প্রশ্ন—নতুন প্রজন্মকে কীভাবে ধরে রাখবে সিপিএম?
ফলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম)-এর সামনে শুধু নতুন মুখ সামনে আনার প্রশ্ন নয়, বরং সেই তরুণ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় স্তরে যুব সদস্যের প্রতিনিধিত্ব যেখানে বেড়েছে, পশ্চিমবঙ্গে সেখানে উল্টো পতন হয়েছে। কেরলের প্রায় ৩০ শতাংশের তুলনায় বাংলার ৮.২ শতাংশের ব্যবধানও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
এই পরিস্থিতিতে তরুণদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত করা, নতুন সদস্য তৈরি করা এবং তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করার উপর আগামী দিনে সিপিএম কতটা জোর দেয়, সেটিই নজরে থাকবে। দলের নিজস্ব রিপোর্টেই যুব সদস্যের ঘাটতিকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—ফলে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠন পুনর্গঠনের আলোচনায় তারুণ্যের প্রশ্ন যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করছে, তা স্পষ্ট।
