দিশা সালিয়ান মৃত্যু রহস্যে ৬ বছর পর ফের তদন্ত, CBI-এর দায়িত্বে সীমা পাহুজা
দিশা সালিয়ান মৃত্যু মামলায় ছয় বছর পর ফের তদন্ত শুরু করেছে CBI। বম্বে হাই কোর্টের নির্দেশে FIR, তদন্তের দায়িত্বে সীমা পাহুজা। জানুন পুরো ঘটনা।
ছয় বছর পর ফের খুলল দিশা সালিয়ান মৃত্যু রহস্যের ফাইল! দায়িত্বে সীমা পাহুজা

মুম্বই, ন্যাশনাল ডেস্ক ৩ : ছয় বছর আগের এক রহস্যমৃত্যুর তদন্তে এবার জুড়ে গেল কলকাতার আরজি কর কাণ্ডের নাম। মুম্বইয়ের অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের প্রাক্তন ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের মৃত্যু মামলায় নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। আর এই হাইপ্রোফাইল তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিবিআইয়ের অভিজ্ঞ আধিকারিক সীমা পাহুজাকে, যিনি এর আগে আরজি কর ধর্ষণ-খুন এবং হাথরসের মতো স্পর্শকাতর মামলার তদন্তে যুক্ত ছিলেন।
২০২০ সালের জুনে দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর পর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এবার বম্বে হাই কোর্টের নির্দেশে সেই পুরনো মামলাতেই নতুন করে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। ১৩ সেপ্টেম্বর এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার পর তদন্তের প্রাথমিক ধাপে পুরনো নথি, পুলিশি তদন্ত, ফরেন্সিক রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত তথ্য এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কে এই সীমা পাহুজা?
সিবিআই আধিকারিক সীমা পাহুজা ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার তদন্তে কাজ করেছেন। তিনি বর্তমানে দিল্লিতে সিবিআইয়ের স্পেশাল ক্রাইমস ইউনিটে কর্মরত। ২০২৪ সালের কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের তদন্ত এবং ২০২০ সালের হাথরস মামলার তদন্তকারী দলের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
তদন্তের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ফরেন্সিক তথ্য বিশ্লেষণেও তাঁর ভূমিকার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। এবার দিশা সালিয়ানের ছয় বছর পুরনো মৃত্যু মামলার তদন্তে তাঁকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে তদন্তকারী আধিকারিক হিসেবে ডেপুটি এসপি পুরান কুমার-সহ সিবিআইয়ের অন্যান্য আধিকারিকরা থাকবেন বলে জানা গিয়েছে।
কী ঘটেছিল দিশা সালিয়ানের সঙ্গে?
২০২০ সালের ৮ জুন রাতে মুম্বইয়ের মালাড এলাকার একটি আবাসনের ১৪ তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হয় ২৮ বছর বয়সি দিশা সালিয়ানের। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর হবু স্বামী রোহন রাইয়ের বাড়িতে একটি পার্টিতে ছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। ওই রাতের ঘটনাক্রম এবং পার্টিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবার নতুন তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।
প্রাথমিক তদন্তের পর মুম্বই পুলিশ দিশার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছিল এবং কোনও অপরাধমূলক যোগসূত্র পাওয়া যায়নি বলে তাদের তদন্তে উঠে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে দিশার পরিবারের তরফে সেই তদন্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়।
এর মাত্র কয়েকদিন পর, ১৪ জুন ২০২০, বান্দ্রার বাড়িতে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুত। দিশা এবং সুশান্তের মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান কম হওয়ায় তখন থেকেই দুই ঘটনাকে ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে দুই মৃত্যুর মধ্যে অপরাধমূলক যোগসূত্রের কোনও প্রামাণ্য তথ্য এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কেন ফের তদন্তের নির্দেশ?
দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে তাঁর মেয়ের মৃত্যু নিছক আত্মহত্যা নয় এবং ঘটনার পিছনে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। পুরনো তদন্তে গাফিলতি ও নথি-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও তিনি তুলেছেন। সেই দাবির ভিত্তিতে তিনি বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন।
এরপর ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বম্বে হাই কোর্ট সিবিআইকে দিশার মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে এফআইআর দায়ের করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তদন্তে উপযুক্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
১৩ সেপ্টেম্বর সিবিআইয়ের এফআইআর
আদালতের নির্দেশের পর দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের বক্তব্যের ভিত্তিতে সিবিআই নতুন এফআইআর নথিভুক্ত করে। এফআইআরে গণধর্ষণ, খুন, ষড়যন্ত্র এবং প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে।
এফআইআরে বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নাম তদন্তের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আদিত্য ঠাকরে, রিয়া চক্রবর্তী, দিনো মোরিয়া, সুরজ পাঞ্চোলি-সহ আরও কয়েকজন। তবে এই নামগুলি এফআইআরে তদন্তের আওতায় উল্লেখ থাকলেও তাঁদের কাউকেই এই পর্যায়ে সিবিআই অভিযুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেনি। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
আদিত্য ঠাকরে অবশ্য দিশা সালিয়ানকে তিনি চিনতেন না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছেন।
এবার তদন্তে কী কী খতিয়ে দেখবে সিবিআই?
ছয় বছরের পুরনো ঘটনা হওয়ায় তদন্তকারীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল পুরনো প্রমাণ ও নথি পুনরায় পরীক্ষা করা। সিবিআই ইতিমধ্যেই মুম্বই পুলিশের কাছ থেকে আগের তদন্তের নথিপত্র চেয়েছে।
তদন্তের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হল—
ঘটনার রাতের সম্পূর্ণ ঘটনাক্রম পুনর্গঠন।
রোহন রাইয়ের বাড়ির পার্টিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের বয়ান নেওয়া।
তৎকালীন মুম্বই পুলিশ আধিকারিকদের বক্তব্য রেকর্ড করা।
পুরনো ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক রিপোর্ট নতুন করে পরীক্ষা করা।
ঘটনাস্থল পুনরায় পরিদর্শন করা।
পুরনো নথি ও তদন্তে কোনও অসঙ্গতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।
মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডেটা ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ পরীক্ষা করা।
এফআইআরে উল্লেখ থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা।
সুশান্তের মৃত্যুর সঙ্গে কি কোনও যোগসূত্র মিলবে?
দিশা সালিয়ানের মৃত্যু এবং তার কয়েকদিন পর সুশান্ত সিংহ রাজপুতের মৃত্যুকে ঘিরে ২০২০ সাল থেকেই নানা জল্পনা রয়েছে। কিন্তু জল্পনা এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়। এখনও পর্যন্ত দুই ঘটনার মধ্যে অপরাধমূলক যোগসূত্র প্রমাণিত হয়নি।
নতুন তদন্তে সেই যোগসূত্রের কোনও তথ্য উঠে আসে কি না, সেটিও তদন্তকারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কেবল অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না; তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি হবে।
ছয় বছর পর দিশা সালিয়ান মৃত্যু মামলার ফাইল ফের খোলার ফলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে দেশজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আরজি কর মামলার তদন্তে যুক্ত থাকা সিবিআই আধিকারিক সীমা পাহুজার হাতে এই তদন্তের দায়িত্ব যাওয়ায় কলকাতার আরজি কর কাণ্ডের প্রসঙ্গও নতুন করে সামনে এসেছে। এখন নজর থাকবে—পুরনো নথি, ফরেন্সিক প্রমাণ এবং সাক্ষীদের বয়ান খতিয়ে দেখে সিবিআই শেষ পর্যন্ত কী তথ্য সামনে আনে।
