গাজায় ফের হামলা! যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সংঘাত, ইসরায়েলকে ঘিরে রাষ্ট্রসংঘে বাড়ছে উদ্বেগ
গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা ও সামরিক তৎপরতার অভিযোগ ঘিরে নতুন উদ্বেগ। নুসেইরাত, মাগাজি ও বুরেজসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলের চিন্তা বাড়ছে।
গাজায় ফের হামলা! ইসরাইলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘে ক্ষোভ
গাজা, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১১ : যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় হামলা ও সংঘাতের পরিস্থিতি ঘিরে ফের তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নুসেইরাত, মাগাজি ও বুরেজের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির এবং অস্থায়ী তাঁবুতে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। লাগাতার হামলা, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে গাজার সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে দাবি বিভিন্ন মানবিক সংস্থার।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি বলে অভিযোগ। বিভিন্ন সময়ে গাজার বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলার খবর সামনে এসেছে। এর ফলে ইতিমধ্যেই বাস্তুচ্যুত হওয়া বহু মানুষ নতুন করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন। শরণার্থী শিবির ও অস্থায়ী তাঁবুগুলিতে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
শরণার্থী শিবিরেই নিরাপত্তাহীনতা
গাজার পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হল, যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের জন্য তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও শরণার্থী শিবিরগুলিও এখন নিরাপদ থাকছে না—এমন অভিযোগ উঠেছে। নুসেইরাত, মাগাজি ও বুরেজের মতো এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন।
অভিযোগ, এসব এলাকায় হামলার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেক পরিবার বারবার নিজেদের আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও তাঁবু, কোথাও স্কুল বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রেই দিন কাটছে হাজার হাজার মানুষের।
‘গাজায় কেউ নিরাপদ নয়’, উদ্বেগ জাতিসংঘের
গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠনগুলি বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। OCHA, UNICEF এবং WHO-সহ একাধিক সংস্থা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলে বর্ণনা করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার তরফে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, “গাজায় এখন কেউ নিরাপদ নয়।” আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বারবার সামনে আনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিশু, মহিলা, প্রবীণ এবং অসুস্থ মানুষ। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবের পাশাপাশি খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
জরুরি মানবিক যুদ্ধবিরতির দাবি
গাজায় অবিলম্বে কার্যকর ও স্থায়ী মানবিক যুদ্ধবিরতি এবং সাধারণ মানুষের কাছে বাধাহীনভাবে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে। জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়েও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির বক্তব্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছনোর ক্ষেত্রে কোনও ধরনের বাধা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। খাদ্য, বিশুদ্ধ জল, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে
গাজায় সামরিক অভিযান ও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে একাধিক দেশ ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেছে। তুরস্ক, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে। কিছু দেশ কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমিয়েছে বা সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার পথে হেঁটেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বলিভিয়া, কলম্বিয়া ও নিকারাগুয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়েও ব্যাপক রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। গাজা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে ইসরায়েলের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
১২ দেশের যৌথ বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা
ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, তুরস্ক, ব্রাজিল, স্পেন ও পাকিস্তানসহ একাধিক দেশ যৌথভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যৌথ বিবৃতিতে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
১৭ লাখ মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তায়
গাজার মানবিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যায়। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী শিবির, অস্থায়ী তাঁবু এবং বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রায় ১৭ লাখ মানুষ খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং নিরাপদ আশ্রয়ের তীব্র সংকটে রয়েছেন বলে মানবিক সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বহু পরিবারের মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই। অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে গিয়ে তাঁদের একদিকে যেমন হামলার আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই মোকাবিলা করতে হচ্ছে খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট।
শিশুদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
গাজার এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিশুদের নিয়ে। যুদ্ধের কারণে বহু শিশু পরিবার, বাড়িঘর ও স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বহু শিশুকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রেই দিন কাটাতে হচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলির মতে, দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির ফলে শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব পড়ছে। পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ জল ও চিকিৎসার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াতেও প্রভাব
গাজায় ফের সংঘর্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক ত্রাণ সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একদিকে যেমন অবিলম্বে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার দাবি জানাচ্ছে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের ওপরও জোর দিচ্ছে। তবে হামলা, পাল্টা হামলা, বাস্তুচ্যুতি এবং ত্রাণ সংকট অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
গাজায় মানবিক বিপর্যয় যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই আন্তর্জাতিক মহলে চাপ বাড়ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা এবং দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশ।
