H-1B ভিসায় ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার ফি! ভারতীয় IT কর্মীদের বড় ধাক্কা
H-1B ভিসায় ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার পর্যন্ত ফি আরোপের প্রস্তাব ঘিরে উদ্বেগ। ভারতীয় IT কর্মী, OPT ও মার্কিন নিয়োগে কী প্রভাব পড়তে পারে?

H-1B ভিসায় ১ লক্ষ ৩ হাজার ডলার ফি! ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য বড় ধাক্কা
সিটি নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
আমেরিকায় কাজের স্বপ্ন দেখা ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদারদের জন্য ফের বড়সড় উদ্বেগের খবর। H-1B ভিসার ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের ফি আরোপের প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) H-1B ভিসার আবেদনের সঙ্গে ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ফি যুক্ত করার স্থায়ী প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে মার্কিন সংস্থাগুলিকে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বিপুল বেশি অর্থ খরচ করতে হবে।
এই প্রস্তাব ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদার এবং তাঁদের নিয়োগকারী সংস্থাগুলির মধ্যে। কারণ, মার্কিন H-1B ভিসাধারীদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ভারতীয় কর্মী এবং তাঁদের নিয়োগকারী মার্কিন সংস্থাগুলির ওপর সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এক লাফে ফি বাড়ানোর প্রস্তাব
H-1B ভিসা মূলত মার্কিন সংস্থাগুলিকে বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, গবেষণা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ক্ষেত্রে এই ভিসার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
এতদিন H-1B ভিসা সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি ফি মিলিয়ে নিয়োগকারী সংস্থাগুলিকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হতো। কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই খরচ এক ধাক্কায় ১,০৩,২৬৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় হিসাব করলে এই অঙ্ক কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন সংস্থাগুলির সিদ্ধান্তেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
ভারতীয় কর্মীদের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
H-1B কর্মসূচির অন্যতম বৃহৎ সুবিধাভোগী দেশ ভারত। বিপুল সংখ্যক ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী প্রতি বছর H-1B ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় কাজের সুযোগ পান। বিশেষ করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে এই ভিসার ব্যবহার অত্যন্ত বেশি।
ফলে ফি যদি সত্যিই এতটা বাড়ানো হয়, তাহলে ভারতীয় কর্মীদের নিয়োগে আগ্রহী মার্কিন সংস্থাগুলির খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর জেরে নতুন নিয়োগ কমে যাওয়া, বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা প্রযুক্তি সংস্থাগুলির নিয়োগ নীতিতে পরিবর্তন আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু H-1B নয়, OPT নিয়েও উদ্বেগ
প্রস্তাবিত নীতির প্রভাব শুধু H-1B ভিসাতেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। আমেরিকায় পড়াশোনা করতে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ Optional Practical Training বা OPT কর্মসূচি নিয়েও নতুন ফি আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
F-1 ভিসায় আমেরিকায় পড়াশোনা শেষ করার পর যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য OPT-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পান। বিশেষ করে STEM অর্থাৎ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিতের শিক্ষার্থীদের কাছে এই কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন করে বিপুল অঙ্কের আবেদন ফি আরোপ করা হলে ভারতীয়সহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার পর আমেরিকায় কাজের সুযোগ নেওয়ার পরিকল্পনাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
চাকরি হারালে ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড নিয়েও প্রশ্ন
H-1B ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগদাতা খোঁজার জন্য বর্তমানে যে গ্রেস পিরিয়ডের ব্যবস্থা রয়েছে, সেটিও আলোচনায় এসেছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মীরা চাকরি হারানোর পর সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত আমেরিকায় থেকে নতুন চাকরির সুযোগ খুঁজতে পারেন।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা কমানো বা নিয়মে আরও কঠোরতা আনার বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। এমনটা হলে H-1B ভিসাধারী কর্মীদের চাকরি চলে যাওয়ার পর দ্রুত নতুন নিয়োগদাতা খুঁজে নেওয়ার চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
আগের আইনি লড়াইয়ের পর নতুন উদ্যোগ
H-1B ভিসা সংক্রান্ত বিপুল ফি আরোপের উদ্যোগ ইতিমধ্যেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। আদালতের হস্তক্ষেপ এবং স্থগিতাদেশের পর এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের নীতিকে আরও স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
বর্তমানে প্রস্তাবটি নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জনসাধারণের মতামত বা Public Comment পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ, এটি এখনও চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়া নিয়ম নয়। প্রস্তাবের ওপর মতামত, আইনি চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
ভারতীয় IT শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ
H-1B ভিসার ওপর দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ভারতীয় IT সংস্থা এবং মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থার ভারতীয় কর্মীরা এই ভিসার মাধ্যমে কাজ করে থাকেন।
ফি যদি প্রস্তাবিত মাত্রায় পৌঁছে যায়, তাহলে নিয়োগকর্তাদের জন্য একজন বিদেশি কর্মীকে H-1B ভিসায় নিয়োগ করার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মী নিয়োগ, বেতন কাঠামো, কর্মী স্থানান্তর এবং ভবিষ্যৎ ভিসা স্পনসরশিপের সিদ্ধান্তে।
এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৫ ডলারের ফি এখনও চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
ফলে শেষ পর্যন্ত ফি কত হবে, কোন ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে এবং H-1B ও OPT-এর নিয়মে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
তবে প্রস্তাবিত এই বিপুল ফি ইতিমধ্যেই ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদার, শিক্ষার্থী এবং মার্কিন নিয়োগকারী সংস্থাগুলির মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমেরিকার অভিবাসন নীতিতে এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে ভারত-মার্কিন প্রযুক্তি কর্মসংস্থান সম্পর্কেও তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
