সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনে আয়কর দফতরের নজরে ৩৯৪ সংস্থা ও ৩৬ পেশাদার
সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনের অভিযোগে ৩৯৪টি সংস্থা ও ৩৬ জন পেশাদারের আর্থিক নথি খতিয়ে দেখছে আয়কর বিভাগ। নজরে বিদেশে অর্থ পাঠানোর তথ্য।
সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনে আয়কর দফতরের নজরে ৩৯৪ সংস্থা ও ৩৬ পেশাদার
সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক : সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠানোর অভিযোগে দেশজুড়ে বড়সড় যাচাই-বাছাই অভিযান শুরু করেছে আয়কর বিভাগ। গত তিন বছরের আর্থিক তথ্য এবং মাটির স্তরে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৩৯৪টি সংস্থা বা সত্তা এবং ৩৬ জন পেশাদারকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
আয়কর বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, একাধিক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাঠিয়েছে। কোথাও নামমাত্র টার্নওভার দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও নিয়মিত কর রিটার্নও দাখিল করা হয়নি। অথচ সেই সংস্থাগুলির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে।
তিন বছরের লেনদেন খতিয়ে দেখছে দফতর
তদন্তকারীরা গত তিন বছরের আর্থিক নথি, কর সংক্রান্ত তথ্য এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর রেকর্ড বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষ করে যে সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক কার্যকলাপের সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেনের পরিমাণের কোনও সামঞ্জস্য নেই, সেগুলিকে বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে, কিছু সংস্থা বাস্তবে খুব কম ব্যবসা করলেও সফটওয়্যার আমদানি, ফ্রেইট চার্জ, কনসাল্টিং সার্ভিস-সহ বিভিন্ন খাত দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাঠিয়েছে।
ভুয়ো ব্যবসায়িক কারণ দেখিয়ে অর্থ পাচারের সন্দেহ
তদন্তে এমন বেশ কিছু লেনদেনের সন্ধান মিলেছে, যেখানে বিদেশে অর্থ পাঠানোর জন্য পরিষেবা বা পণ্য আমদানির কারণ দেখানো হলেও সেই দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত ব্যবসায়িক নথি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
আয়কর দফতর এখন খতিয়ে দেখছে, সত্যিই ওই সফটওয়্যার বা পরিষেবা আমদানি করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থার সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি না এবং যে পরিমাণ অর্থ পাঠানো হয়েছে, তার সঙ্গে পরিষেবা বা পণ্যের প্রকৃত মূল্যের কোনও সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
ঘোষিত ঠিকানায় নেই ব্যবসা!
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। চিহ্নিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত বা নিবন্ধিত ঠিকানায় বাস্তবে কোনও উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক কার্যকলাপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
কিছু ক্ষেত্রে সংস্থাগুলি নামমাত্র ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধিত ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রকৃত মালিক, ব্যবসার ধরন এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর পিছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় ১১৭ সংস্থা
আয়কর বিভাগের নজরে আসা ৩৯৪টি সত্তার মধ্যে ১১৭টি প্রতিষ্ঠান দেশের স্থলসীমান্তবর্তী রাজ্য বা জেলায় অবস্থিত বলে জানা গিয়েছে। এই তথ্যকে তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত সংস্থাগুলির বিদেশি লেনদেনের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং অর্থের গতিপথ আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
নজরে ৩৬ পেশাদার
শুধু সংস্থাগুলিই নয়, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পেশাদারদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। মোট ৩৬ জন পেশাদার, যাঁদের মধ্যে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টও রয়েছেন, তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কর সংক্রান্ত শংসাপত্র বা Form 15CB ইস্যু করার সময় তাঁরা প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং লেনদেনের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
নথি যাচাইয়ে গাফিলতির অভিযোগ
প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহ করা হচ্ছে, কয়েকটি ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নথি ও ব্যবসায়িক তথ্য যাচাই না করেই Form 15CB বা সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, সংশ্লিষ্ট পেশাদাররা কী কী নথির ভিত্তিতে শংসাপত্র দিয়েছিলেন এবং লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে তাঁদের কাছে কী তথ্য ছিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের বক্তব্যও নেওয়া হতে পারে।
অর্থের উৎস ও গন্তব্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিদেশে পাঠানো অর্থের প্রকৃত উৎস এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় গিয়েছে তা শনাক্ত করা। কোনও নির্দিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ ঘুরিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিদেশি সংস্থাগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা
আয়কর বিভাগের এই দেশব্যাপী যাচাই-বাছাই অভিযানের ফলে সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনের একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং চিহ্নিত সব সংস্থা বা পেশাদার কোনও বেআইনি কাজে যুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেন, কর রিটার্ন, বিদেশি পেমেন্ট এবং ব্যবসায়িক কার্যকলাপের বিস্তারিত যাচাইয়ের পরই প্রকৃত অনিয়মের ছবি স্পষ্ট হবে। অর্থ পাচার বা কর ফাঁকির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই মুহূর্তে আয়কর বিভাগের নজর মূলত তিনটি বিষয়ে—ভুয়ো বা নামসর্বস্ব সংস্থার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠানো, বৈদেশিক লেনদেনের আড়ালে প্রকৃত ব্যবসায়িক তথ্য গোপন করা এবং সেই লেনদেনকে বৈধতার ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাদারদের ভূমিকা।
