জলবায়ু রক্ষায় উন্নয়নের সঙ্গে ভারসাম্য, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে ভারতের অগ্রগতি: প্রধানমন্ত্রী মোদী
বিজ্ঞান ভবনে NGT-র আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিচ্ছন্ন শক্তি, সৌর-বায়ু বিদ্যুৎ, পরমাণু শক্তি ও টেকসই উন্নয়নে ভারতের অগ্রগতির কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
জলবায়ু রক্ষায় উন্নয়নের সঙ্গে ভারসাম্য, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে ভারতের বড় অগ্রগতি: বিজ্ঞান ভবনে প্রধানমন্ত্রী

সিটি নিউজ বাংলা, ন্যাশনাল ডেস্ক ৫ : জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসারে ভারতের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) আয়োজিত ‘দ্য ফিউচার অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট ডায়নামিক্স’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন তিনি। দুই দিনের এই সম্মেলনে ভারত-সহ ১৭টি দেশের বিচারক ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সরকারি আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্যের উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য, দ্রুত উন্নয়নের পাশাপাশি সেই উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করাই ভারতের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি গত এক দশকেরও বেশি সময়ে পুনর্নবীকরণযোগ্য ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন শক্তির ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
সৌরশক্তিতে বড় অগ্রগতি, বাড়ছে বায়ু ও জলবিদ্যুৎ
পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসারের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ভারতের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। প্রায় ১২ বছর আগে যেখানে দেশের সৌরশক্তির ক্ষমতা ছিল মাত্র ২ গিগাওয়াট, বর্তমানে তা ১৬০ গিগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে।
শুধু সৌরশক্তিই নয়, একই সময়ে বায়ু শক্তির ক্ষমতাও তিন গুণ বেড়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ হয়েছে। তাঁর দাবি, এই সমস্ত উদ্যোগের ফলে ভারতের মোট নন-ফসিল বা জীবাশ্ম জ্বালানি-বহির্ভূত শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা গত ১২ বছরে প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
পরমাণু শক্তিতেও বাড়তি জোর
পরিচ্ছন্ন শক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বলতে গিয়ে পরমাণু শক্তির উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ভারতের শক্তির চাহিদা এবং পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণে পরমাণু শক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পরমাণু শক্তি প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত আপত্তি এবং আদালতে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে আধুনিক পরমাণু প্রযুক্তি এবং Small Modular Reactor বা SMR-এর মতো প্রযুক্তির প্রসারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এই ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উন্নত দেশগুলিকে বার্তা
কার্বন নিঃসরণের দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রসঙ্গও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর প্রায়ই কার্বন নিঃসরণের দায় চাপানো হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির নিঃসরণ ভারতের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলিকে অনেক সময় পরিবেশগত সমস্যার জন্য দায়ী করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ভারতের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ এখনও বিশ্ব গড়ের অর্ধেকেরও কম। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
‘উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা পাশাপাশি’
পরিবেশ রক্ষা করতে গিয়ে উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়নের পথ তৈরি করার উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের উন্নয়ন একই সঙ্গে দ্রুত এবং টেকসই হওয়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছে।
এক্ষেত্রে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ এবং পরমাণু শক্তির পাশাপাশি সবুজ হাইড্রোজেন ও পরিচ্ছন্ন পরিবহণের মতো ক্ষেত্রগুলির কথাও তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন চালু হওয়ার বিষয়টিকেও পরিচ্ছন্ন পরিবহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপরও গুরুত্ব
NGT-র উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মূল লক্ষ্য পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যায় বিচারব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং পরিবেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিনিময়। সম্মেলনে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবেশ আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় ভারত শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির কথাই বলছে না, বরং পরিচ্ছন্ন শক্তির পরিকাঠামো বাড়ানোর উপরও জোর দিচ্ছে। সৌর ও বায়ুশক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে পরমাণু শক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং পরিচ্ছন্ন পরিবহণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তাই উঠে এসেছে বিজ্ঞান ভবনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সারকথা—পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে না দেখে, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও শক্তির মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ভারতের পথ।
