প্রায় ৯ বছর পর জগতার সিং জোহালকে ৭ NIA মামলায় জামিন দিল দিল্লি হাইকোর্ট
প্রায় ৯ বছর হেফাজতে থাকার পর ব্রিটিশ-স্কটিশ নাগরিক জগতার সিং জোহালকে ৭টি NIA মামলায় জামিন দিল দিল্লি হাইকোর্ট। একাধিক শর্তে মিলল জামিন।
প্রায় ৯ বছর পর জগতার সিং জোহালকে জামিন দিল দিল্লি হাইকোর্ট

নয়াদিল্লি, ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ১০ : দীর্ঘ প্রায় ন’বছর ধরে ভারতে বন্দি থাকার পর ব্রিটিশ-স্কটিশ শিখ নাগরিক জগতার সিং জোহাল ওরফে ‘জগ্গি’-কে জামিন দিল দিল্লি হাইকোর্ট। ২০১৭ সালে পাঞ্জাবে গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগে মামলা চলছিল। শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি নবীন চাওলা ও বিচারপতি রবীন্দর দুদেজার ডিভিশন বেঞ্চ তাঁকে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)-র সাতটি মামলায় জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
জোহালের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবের লুধিয়ানা ও জলন্ধর এলাকায় ২০১৬-১৭ সালে সংঘটিত একাধিক টার্গেটেড হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নিষিদ্ধ খালিস্তান লিবারেশন ফোর্স বা KLF-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার এবং ওই নেটওয়ার্কে অর্থ ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল তদন্তকারী সংস্থা। তবে জামিনের অর্থ মামলা থেকে অব্যাহতি বা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান।
২০১৭ সালে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে গ্রেফতার
জগতার সিং জোহাল স্কটল্যান্ডের ডামবার্টনের বাসিন্দা ব্রিটিশ নাগরিক। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাঞ্জাবে আসার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পরবর্তীতে NIA-র হাতে যায়।
NIA-র অভিযোগ ছিল, জোহাল কথিত KLF নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পাঞ্জাবে সংঘটিত কয়েকটি টার্গেটেড হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন UAPA, অস্ত্র আইন এবং খুন-সহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ
জোহালের জামিনের আবেদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। দিল্লি হাইকোর্ট উল্লেখ করেছে, তিনি আট বছরেরও বেশি সময় ধরে হেফাজতে রয়েছেন এবং মামলাগুলির বিচার দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আদালত আরও উল্লেখ করে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির একটিতে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে জোহালকে খালাসও দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, বাকি মামলাগুলিতে বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলছে। একটি মামলায় ১২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৪০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের তথ্যও আদালতের সামনে উঠে আসে।
জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
জোহালের জামিনের বিষয়টি এর আগে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিল। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে শীর্ষ আদালত মামলাগুলি পুনর্বিবেচনার জন্য দিল্লি হাইকোর্টে ফেরত পাঠায়। এরপর নতুন করে তাঁর জামিনের আবেদন বিবেচনা করে হাইকোর্ট।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি হাইকোর্ট জোহালের জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বিষয়টি ফের হাইকোর্টে আসে।
একাধিক শর্তে জামিন
হাইকোর্ট জোহালকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়নি। আদালত একাধিক শর্ত আরোপ করেছে। তাঁকে ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড এবং একই পরিমাণের দু’টি জামিনদার দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁর পাসপোর্ট থাকলে তা আদালতে জমা দিতে হবে; পাসপোর্ট না থাকলে সেই মর্মে হলফনামা দিতে হবে।
তাঁকে তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে নিজের যোগাযোগের তথ্য জমা দিতে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাঁর কাছে হাজিরা দিতে হবে। একইসঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা, সাক্ষী বা প্রমাণের ওপর কোনও প্রভাব না ফেলা এবং আদালতের নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও আদালত জোহালকে এমন কোনও WhatsApp গ্রুপ বা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যুক্ত না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ হিসেবে বর্ণিত বিষয়বস্তু আপলোড, প্রচার বা ছড়ানো হয়।
পরিবারে স্বস্তি, তবে মুক্তির প্রক্রিয়া এখনও বাকি
জামিনের খবর সামনে আসার পর জোহালের পরিবার ও তাঁর সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তাঁর ভাই গুরপ্রীত সিং জোহালও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে আদালতের জামিনের নির্দেশের পরও প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জগতার সিং জোহালের কারাগার থেকে বের হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ, দীর্ঘ বন্দিজীবনের পর জামিনের পথ খুললেও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির আইনি প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হচ্ছে না। এখন আদালতের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে জোহালের মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা।
