কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে ভক্তের ঢল, ৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী সমাগমের সম্ভাবনা
কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে ভক্তের ঢল। ৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী সমাগমের সম্ভাবনা। নিরাপত্তায় প্রায় ৪ হাজার পুলিশ, CCTV ও ড্রোনে নজরদারি।
কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে ভক্তের ঢল! ৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থীর সমাগমের সম্ভাবনা

সিটি নিউজ বাংলা, বীরভূম, স্টেট ডেস্ক ৭ :
আজ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার। দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হচ্ছে পবিত্র কৌশিকী অমাবস্যা। শক্তি আরাধনা, দেবী উপাসনা এবং তন্ত্রসাধনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষ তিথিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ভক্তদের ঢল নেমেছে বিভিন্ন শক্তিপীঠ ও কালী মন্দিরে। তবে এবারের কৌশিকী অমাবস্যায় বিশেষ নজর রয়েছে বীরভূমের বিখ্যাত তারাপীঠে। মন্দির চত্বর থেকে শুরু করে আশপাশের এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ১১ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হয়েছে এবং তা শেষ হবে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। ফলে কৌশিকী অমাবস্যার মূল পূজা, নিশি আরাধনা এবং তন্ত্রসাধনার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বৃহস্পতিবার রাতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
‘তারা রাত্রি’-তে তারাপীঠে বিশেষ আয়োজন
কৌশিকী অমাবস্যার রাত তারাপীঠের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতকে অনেকেই ‘তারা রাত্রি’ বা ‘সিদ্ধি রাত্রি’ হিসেবে মানেন। তারাপীঠের মহাশ্মশানকে ঘিরে তন্ত্রসাধনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ তিথিতে তারাপীঠের মহাশ্মশানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন মহাযোগী সাধক বামাক্ষ্যাপা এবং দেবর্ষি বশিষ্ঠ মুনি। সেই কারণেই কৌশিকী অমাবস্যার রাতে তারাপীঠে ভক্তদের পাশাপাশি সাধু-সন্ন্যাসী ও তন্ত্রসাধকদেরও বিশেষ সমাগম হয়।
পুরাণে কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য
হিন্দু পুরাণের সঙ্গে কৌশিকী অমাবস্যার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত পুরাণকথা অনুযায়ী, দেবী পার্বতীর দেহকোষ থেকে অসুর বধের উদ্দেশ্যে দেবী কৌশিকী আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাই শক্তি আরাধনার ক্ষেত্রে এই তিথিকে অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
এই দিনে বহু ভক্ত উপবাস, বিশেষ পূজা, মন্ত্রজপ ও দেবী আরাধনায় অংশ নেন। আবার তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্রেও কৌশিকী অমাবস্যার রাতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
৬ লক্ষেরও বেশি ভক্ত সমাগমের সম্ভাবনা
এবার তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে বিপুল ভক্ত সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থীর সমাগম হতে পারে। ফলে মন্দির চত্বর, মহাশ্মশান এবং সংলগ্ন এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ইতিমধ্যেই তারাপীঠে পৌঁছেছেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিরাপত্তায় মোতায়েন প্রায় ৪ হাজার পুলিশ
বিপুল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ জোর দিয়েছে প্রশাসন। তারাপীঠ মন্দির ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৪ হাজার পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
ভিড়ের মধ্যে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকাকে একাধিক নিরাপত্তা জোনে ভাগ করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
CCTV ও ড্রোনে কড়া নজরদারি
শুধু মাটিতে পুলিশ মোতায়েন নয়, আকাশপথেও নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। CCTV ক্যামেরার পাশাপাশি ড্রোনের সাহায্যে ভিড় এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
বিশেষ করে মন্দির চত্বর, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, পার্কিং এলাকা এবং জনসমাগম বেশি হচ্ছে এমন জায়গাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের জন্য বিশেষ ট্রেন
কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে তারাপীঠে ভক্তদের বিপুল সমাগমের কথা মাথায় রেখে রেল পরিষেবাতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য হাওড়া ও রামপুরহাটের মধ্যে বিশেষ ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ফলে সড়কপথের পাশাপাশি রেলপথেও বহু পুণ্যার্থী তারাপীঠে পৌঁছনোর সুযোগ পাচ্ছেন।
কালীঘাট-দক্ষিণেশ্বরেও ভক্তদের ঢল
শুধু তারাপীঠ নয়, কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে কলকাতার কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, লেক কালীবাড়ি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন কালীমন্দির ও শক্তিক্ষেত্রেও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
সকাল থেকেই বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাতের দিকে বিশেষ নিশি আরাধনা ও পূজাকে কেন্দ্র করে ভক্ত সমাগম আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে কৌশিকী অমাবস্যাকে ঘিরে এদিন রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে ধর্মীয় আবহ। আর তারাপীঠে বিপুল ভক্ত সমাগমের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে একদিকে যেমন বিশেষ পূজা ও তন্ত্রসাধনার প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে তেমনই নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক ব্যবস্থা।
